বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানিয়েছেন, ‘আইসিইউতে চিকিৎসাধীন বেগম জিয়া। মেডিকেল সাইয়েন্সের ভাষায় বললে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, সেটা উনি রেসপন্স বা গ্রহণ করছেন। তার উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে দেশি-বিদেশি চিকিৎসকরা কাজ করে যাচ্ছেন। একজন সংকটাপন্ন রোগীর জন্য সর্বোচ্চ যে চিকিৎসা প্রয়োজন সে চিকিৎসাই উনাকে দেওয়া হচ্ছে।’ তাকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসার ব্যাপারেও আশাবাদী তার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ড বলে জানান তিনি। গতকাল বুধবার রাতে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডা. জাহিদ বেগম জিয়ার স্বাস্থ্যের বিষয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করতে গিয়ে এসব কথা বলেন।
ডা. জাহিদ বলেন, ‘আমরা আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে খালেদা জিয়ার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সব সদস্য চিকিৎসা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত সজাগ ও দায়িত্বশীলভাবে ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। এই মেডিকেল বোর্ডে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়ার চিকিৎসকরাও সংযুক্ত। সময় একেক দেশে একেক রকম হওয়ায় রাতের বেলায় বোর্ড বসতে হয়। খেয়াল রাখতে হয় যাতে অস্ট্রেলিয়ায় গভীর রাত না হয়। সব কিছু মিলিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে দেশের ও দেশের বাইরের চিকিৎসকরা, সর্বোপরি বেগম জিয়ার আত্মীয় বিশেষ করে তার পুত্রবধূ ডা. জোবায়েদা রহমান সার্বক্ষণিকভাবে চিকিৎসার সমন্বয় করছেন।’
তিনি জানান, ‘বেগম জিয়ার আরেক পুত্রবধূ সৈয়দা শামিলা রহমান, বেগম জিয়ার ভাই শামীম এস্কান্দার, বোনসহ সবাই এই চিকিৎসার ব্যবহারে দলের বাইরেও সব সময় যোগাযোগ রাখছেন। দলের মহাসচিব, জাতীয় স্থায়ী কমিটির বাইরে দলের সব নেতাকর্মী, অন্যান্য দলের নেতাকর্মীরা তার চিকিৎসার খোঁজখবর নিচ্ছেন। রাষ্ট্রপতি, প্রধান উপদেষ্টাসহ সরকারের সর্বোচ্চ পর্র্যায়ে, সব শ্রেণি-পেশার মানুষ তার চিকিৎসার ব্যাপারে উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন।’
ডা. জাহিদ বলেন, ‘গত শুক্রবার আমরা বেগম জিয়াকে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, একদিকে মেডিকেল অ্যাম্বুলেন্সের কারিগরি ত্রুটি, অন্যদিকে দেশনেত্রীর স্বাস্থ্যের অবস্থা ফ্লাই করার উপযুক্ত না থাকার কারণে সে সময় আমরা ওনাকে দেশের বাইরে স্থানান্তর করতে পারিনি। কিন্তু ওনার চিকিৎসার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ড সার্বক্ষণিকভাবে ওনাদের পরামর্শ দিয়েছে। তারা চেষ্টা করছেন যাতে সর্বোত্তম সেবা নিশ্চিত করা যায়। পৃথিবীর মধ্যে ভালো সেবা যাতে তিনি পেতে পারেন, এখানে রেখে বোর্ডের সদস্যরা পরামর্শ ও চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রেখেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বোর্ডের সব সদস্য আশাবাদী বেগম জিয়ার সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা যাবে। পরে যে কোনো সময়ে তাকে দেশের বাইরে প্রয়োজনে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হতে পারে। এই পর্যায়ে এখনো বলার সময় আসেনি। কারণ আমরা একবার কথা বলেছিলাম। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যে ধরনের ব্যবস্থা ওনার জন্য রেখেছেন, সেটা আমাদের কারও ধরাছোঁয়ার মধ্যে পড়ে না। আল্লাহর রহমত ও মানুষের দোয়া সব ধরনের মানুষের প্রচেষ্টা এবং চিকিৎসার সঙ্গে সম্পৃক্ত চিকিৎসক ও নার্সসহ সব পর্যায়ে কর্মীদের অব্যাহত প্রচেষ্টা, তার পরিবার ও দেশের ১৭ কোটি মানুষ উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। এ অবস্থায় আমরা আকুল আবেদনে জানাই, সবাই দোয়া করবেন তার সুস্থতার জন্য। সেটি যাতে অব্যাহত রাখেন। আল্লাহর রহমতে তিনি যেন এই সংকট অতিক্রম করতে পারেন।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘উনি আইসিইউতে চিকিৎসাধীন আছেন। এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার সর্বোচ্চ পর্র্যায়ে একটি সংকটাপন্ন মানুষের জন্য যেটি প্রয়োজন সেই চিকিৎসার মধ্যই তিনি আছেন। এটি নিয়ে কোনো অবস্থাতেই গুজবে কান না দেওয়ার জন্য সবার প্রতি বিনীত অনুরোধ করব। সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা রকম কথা বলা হয়, তবে চিকিৎসকদের ছাড়া কারও কথায় তথ্য প্রচার না করার অনুরোধ থাকবে।’
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যেহেতু মানুষের উৎকণ্ঠা, শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসা বেগম জিয়ার জন্য আছে। সর্বোপরি মনে রাখতে হবে, তিনি একজন রোগী। তার ব্যক্তিগত সব কিছু আমরা বলে দিতে পারিনি। এতটুকু বলতে পারি, চিকিৎসকরা যে চিকিৎসা তাকে দিচ্ছেন তা উৎকৃষ্ট মানের। এভারকেয়ারে সর্বোচ্চ চিকিৎসা পাচ্ছেন খালেদা জিয়া।’
এদিকে গতকাল সকালে রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বিএনপির আয়োজনে ‘দেশ গড়ার পরিকল্পনার কর্মসূচি’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আজ পর্যন্ত পত্রপত্রিকায় যা দেখলাম উনার অবস্থা স্থিতিশীল অর্থাৎ খারাপ হয়নি। আমরা পরম দয়ালু আল্লাহতায়ালার কাছে কামনা করব, যেন খারাপ কিছু না হয়। এখন যেন অবস্থা একটু ভালোর দিকে যায়। উনাকে (খালেদা জিয়া) আমাদের খুব প্রয়োজন। এই দেশের জন্য দেশনেত্রীর এই মুহূর্তে এত প্রয়োজন যে একজন স্বীকৃত অভিভাবক হিসেবে বাংলাদেশের সব দল স্বীকার করে। এমনকি আমাদের চরম শত্রু যে দলগুলো আছে, আমাদের বিএনপিকে পছন্দ করে না তারাও স্বীকার করেছে খালেদা জিয়া এখন দলমত নির্বিশেষে সব মানুষের অভিভাবক।’
এভারকেয়ারে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
গতকাল বিকেলে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিতে এভারকেয়ার হাসপাতালে যান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম। সেখানে তিনি প্রায় এক ঘণ্টার অধিক সময় পর্যন্ত অবস্থান করেন।
জানা গেছে, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বেগম জিয়ার চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন। তার বর্তমান শারীরিক অবস্থা, চলমান চিকিৎসা এবং পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে অবগত হন।
৮০ বছর বয়সী সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিসের পাশাপাশি কিডনি, লিভার, ফুসফুস, হৃদযন্ত্রসহ নানা রোগে ভুগছেন। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় গত ২৭ নভেম্বর তাকে নেওয়া হয় এভারকেয়ারের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ)। খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত দেশি-বিদেশি দুই ডজনের মতো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ড প্রতিদিন বৈঠক করে চিকিৎসায় পরিবর্তন আনছে।
