কাটারিভোগে কাটা পড়ছে ফসল বৈচিত্র্য

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৭:৪৯ এএম

দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে এখন সোনালি ধানের শিষে ভরা। বাতাসে ভাসছে কাটারিভোগ সুগন্ধি ধানের মিষ্টি গন্ধ। চলতি আমন মৌসুমে উপজেলায় রেকর্ড পরিমাণ জমিতে এই প্রিমিয়াম জাতের ধান চাষ হয়েছে। উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এবার ১৩ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে কাটারিভোগ (ব্রি-৩৪) সুগন্ধি ধান আবাদ করা হয়েছে, যা মোট আমন আবাদের ৪৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। প্রতি হেক্টরে গড় ফলন ৩ দশমিক ৭৫ টন ধরে মোট ৫১ হাজার টন ধান ও প্রায় ৩৫ হাজার টন সুগন্ধি চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, ভালো দামের আশায় অনেক কৃষক ঝুঁকছেন এই ধান আবাদে। এতে করে একদিকে যেমন মাটির উর্বরতা কমছে তেমনি অন্যদিকে ফসলের বৈচিত্র্য হ্রাস পাচ্ছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাজিব হুসাইন জানান, এবার রোগবালাই প্রায় নেই বললেই চলে। কৃষি বিভাগের নিবিড় তদারকি, সময়মতো পরামর্শ ও কীটনাশক প্রয়োগের কারণে ফলন অত্যন্ত সন্তোষজনক। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে আগামী ৮-১০ দিনের মধ্যে ধান কাটা শুরু হবে।

তবে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘কাটারিভোগ ধানের লোভে কৃষকরা অন্য ফসল চাষ করছেন না। এতে মাটির উর্বরতা কমছে এবং ফসলের বৈচিত্র্য হ্রাস পাচ্ছে। আমরা বারবার সচেতন করছি, কিন্তু লাভের আশায় কৃষক শুনছেন না।’

পার্বতীপুরের সুগন্ধি চালের সুনাম দেশ জুড়ে। হামিদপুর, বেলাইচ-ি, রামপুর, মন্মথপুর, পলাশবাড়ী ও চন্ডিপুর এই ছয়টি ইউনিয়নেই সবচেয়ে বেশি কাটারিভোগ চাষ হয়। এ ছাড়া চিনি কাটারি, জিরা কাটারি, জটা কাটারি, ফিলিপাইন কাটারি, কালো জিরা, চল্লিশ জিরাসহ একাধিক স্থানীয় ও উন্নত জাতের সুগন্ধি ধান এ অঞ্চলে চাষ হয়। এসব চাল সরু, লম্বা ও রান্নায় অত্যন্ত সুগন্ধযুক্ত হওয়ায় দেশের বাইরেও এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।

প্রতি সপ্তাহে শনি ও মঙ্গলবার পার্বতীপুর পুরাতন বাজারে বসে দেশের বৃহত্তম সুগন্ধি ধানের হাট। এ ছাড়া পৌরসভার উদ্যোগে রবি ও বুধবারও বিশেষ হাটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মেসার্স বাদল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী ও সাবেক প্যানেল মেয়র মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে ধান কেনাবেচা।

প্রাণ, স্কয়ার, এসিআই, সিটি গ্রুপ, রূপচাঁদা, ইশান এগ্রো, ইফাদ, ইরফান, নবাব অটোসহ বড় বড় অটোরাইস মিল এখান থেকে ধান কিনে নিয়ে প্যাকেটজাত করে দেশের অভিজাত বাজারে ও মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করছে।

গত মৌসুমে শুধু পার্বতীপুর থেকেই প্রায় ৮-১০ হাজার টন সুগন্ধি চাল বিদেশে গেছে বলে ব্যবসায়ীরা জানান। তবে কৃষকদের খরচও বেড়েছে।

রামপুর ইউনিয়নের কৃষক মো. আকরাম হোসেন বলেন, ‘বিঘাপ্রতি ২৫-২৮ হাজার টাকা খরচ পড়েছে। কারেন্ট পোকার আক্রমণে ক্ষতি হয়েছে। ধানের দাম না বাড়লে লোকসান গুনতে হবে।’

বেলাইচন্ডি ইউনিয়নের আতিকুর রহমান রুবেল জানান, তিনি ৮ বিঘা জমিতে চাষ করেছেন। ফলন ভালো হলেও শ্রমিক, সার ও কীটনাশকের দাম বেশি হওয়ায় লাভ কম হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, শুধু পার্বতীপুর নয়, সদর, বিরল, ফুলবাড়ী, চিরিরবন্দর উপজেলাতেও প্রচুর সুগন্ধি ধান হয়। এ অঞ্চল বাংলাদেশের ‘সুগন্ধি চালের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

সরকারিভাবেও এখানকার কাটারিভোগ চালকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে নিবন্ধনের প্রক্রিয়া চলছে।

আপাতত মাঠে সোনালি শিষ আর বাতাসে সুগন্ধ নিয়ে অপেক্ষায় আছেন কৃষক। দাম ভালো পেলে এবারও দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশের বাজারে ঠাঁই করে নেবে পার্বতীপুরের কাটারিভোগ সুগন্ধি চাল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত