এই কথাটির অর্থ হলো ‘অন্যের ভালো চাইলে নিজের ভালো হয়, আর অন্যের ক্ষতি চাইলে নিজের ক্ষতি হয়’। এক কথায়, ‘যদিচ্ছা ভাব, তদিচ্ছা লাভ’ কথাটি শেখায় যে প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসা নয়, জীবনের প্রকৃত সফলতা ও শান্তি নিহিত আছে, অন্যের প্রতি শুভ চিন্তা ও কর্মে। সবার উচিত, অন্যের কল্যাণ কামনা করা। কারণ এর মাধ্যমে জীবনে কল্যাণ ও শান্তি লাভ করতে পারি। অন্যের অকল্যাণ চিন্তা নিজেরই অকল্যাণের কারণ। ‘বাংলাদেশের মানুষ আর বিভেদ-বিরোধ ও প্রতিহিংসা-প্রতিশোধের রাজনীতি চায় না’ বলে উল্লেখ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশ এখন একটি পরিণত দেশ। এই পরিণত বাংলাদেশে জনগণ আর বিভেদ-বিরোধ ও প্রতিহিংসা-প্রতিশোধের রাজনীতি চায় না। জনগণ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন চায়। রাজধানীর শাহবাগ চত্বরে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তারেক রহমান। ১০ মে ২০১৭ ইং তারিখে ইনস্টাগ্রামে, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বরাত দিয়ে প্রকাশ পায় যে, ‘প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে ভবিষ্যৎমুখী এক নতুন ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চায় বিএনপি। দেশের আমজনতা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের শাসনকাল কেমন, তা এখনো জানেন না।
১০ মে ২০১৭ ইং তারিখে ইনস্টাগ্রামে উল্লিখিত সময়ের পর ক্ষমতায় আসার সুযোগ হয়নি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ারও। ‘যদিচ্ছা ভাব, তদিচ্ছা লাভ’-এর প্রমাণ হাতে হাতে পাওয়া গেছে বিগত সরকার প্রধানের উক্তি থেকে। বিদেশ থেকে যে ক’জন লেখক ক্ষমতাসীন সরকারের তাঁবেদারি না করে, তত্ত্ববহুল লেখা পাঠাতেন তাদের মধ্যে অন্যতম আ ন ম সিরাজুর রহমান। আ ন ম সিরাজুর রহমান পরলোকগমনের কয়েকদিন আগে ‘প্রতিশোধস্পৃহারও কি কোনো সীমা থাকতে নেই’ শিরোনামে একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় কলামটি প্রকাশিত হয়েছিল। গুগলে চার্চ করলে লেখাটি এখনো পাওয়া যাবে। লেখক বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী ব্রিটিশ সাংবাদিক ও সম্প্রচারকারী। ১৯৬০ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত তিনি বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে কাজ করেন এবং বিবিসি বাংলার উপ-প্রধান পদ থেকে অবসরে যান। পরবর্তী সময়ে তিনি বিভিন্ন সংবাদপত্রে কলাম লিখতেন। সাংবাদিকতায় অনন্য অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করে। তার কলাম থেকে কিছু উদ্ধৃতি উল্লেখ করা হলো। ‘পরপর কয়েকটি রক্তঝরা সামরিক অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের কার্যকর ক্ষমতা হাতে পান। বহু প্রমাণ আছে, গোড়ার মুহূর্ত থেকেই তিনি হারানো স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সঙ্কল্প নিয়েছিলেন। হাসিনা ও রেহানাকে দেশে ফিরিয়ে আনার কূটনৈতিক উদ্যোগ তিনি কিছু দিনের মধ্যেই নিয়েছিলেন। শেষে পঞ্চম সংশোধনী মোতাবেক সংবিধানে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দল পুনরুজ্জীবিত করার পর আওয়ামী লীগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. কামাল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাককে দিল্লি পাঠিয়ে দুই বোনকে দেশে ফিরিয়ে আনেন।’
বুশ হাউজে হাসিনার সম্মানে চা-চক্র : শেখ হাসিনা প্রায় দুই ডজন সহচর নিয়ে বুশ হাউজে হাজির হলে আমরা হতাশ হয়েছিলাম। সহকর্মী জন রেনার ও আমি স্থির করলাম যে, আমরা দুজন নেত্রীকে অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্টুডিওতে নিয়ে যাব এবং সেখানে সব বিষয়ে তার মতামত জানার চেষ্টা করব। প্রথমেই শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার নেবেন জন রেনার। আলোচনার সূত্রপাত তিনি করেছিলেন ইংরেজিতে এভাবে :
জন রেনার : শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত হওয়ায় আপনাকে অভিনন্দন। দলনেত্রী হয়ে আপনার ভালো লাগছে?
শেখ হাসিনা : (ইংরেজিতে) না, রাজনীতি আমার ভালো লাগে না। আমি তা ঘৃণা করি।
জন রেনার : (বিস্মিত হয়ে) তাহলে আপনি কেন রাজনীতিতে এলেন? কেন দলনেত্রী হতে গেলেন?
শেখ হাসিনা : (ক্রুদ্ধ, ইংরেজিতে) ওরা আমার বাবাকে খুন করেছে, আমার মাকে খুন করেছে, আমার ভাইদের খুন করেছে। তাদের জন্য কেউ এক ফোঁটা চোখের পানি ফেলেনি। আমি তার প্রতিশোধ নেব। প্রতিশোধ নেব বলেই রাজনীতিতে এসেছি।
সে মুহূর্ত থেকে আওয়ামী লীগের সব কথা ও কাজে প্রতিশোধস্পৃহার লক্ষণ খুব প্রকট। দুই বোন দিল্লি থেকে ঢাকা এসেছিলেন, ১৯৮১ সালের ১৭ মে। তার ১৩ দিনের মাথায় অত্যন্ত জটিল এক সামরিক ষড়যন্ত্রে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। এর মাধ্যমেই যেন প্রতিশোধ নেওয়া শুরু হয়। ‘জুলাই আন্দোলন’ বা কোটা সংস্কার আন্দোলনে সরকারি হিসাব অনুযায়ী ৮৪৪ জন নিহত হয়েছেন। যদিও জাতিসংঘ ও অন্যান্য সূত্র অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা ৬৫০ থেকে ৮০০-এর বেশি। শুধু তাই নয়, ২০০৮ সাল থেকে ৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ২৭৬ জনকে ক্রসফায়ারে হত্যা এবং ১৫৩ জনকে গুমের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনে পৃথক আবেদন দাখিল করা হয়েছে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টির ফেসবুকসহ নির্ভরযোগ্য সংবাদে প্রকাশ, ‘বাংলাদেশে ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী সময়ে বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব জনাব তারেক রহমানের ওপর ভারতীয় মদদপুষ্ট দেশীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় পথভ্রষ্ট কর্মকর্তা যে নির্যাতন করেছে; সেটিকে যখন আমলে আনি তখন সেই নির্যাতন নাভালনিকে মনে করিয়ে দেয়। পার্থক্য হলো, নাভালনি পরবর্তীকালে কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন আর তারেক রহমান মহান আল্লাহপাকের অশেষ রহমতে সূদুর লন্ডনে নির্বাসিত হয়ে জীবনযাপন করছেন ।
দেশের আমজনতা চায়, ‘বাংলাদেশ এখন একটি পরিণত দেশ। এই পরিণত বাংলাদেশে জনগণ আর বিভেদ-বিরোধ ও প্রতিহিংসা-প্রতিশোধের রাজনীতি চায় না।’ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সম্মানিত চেয়ারম্যানের এ উক্তির প্রতিফলন যেন আমজনতা দেখতে পায়। ভারপ্রাপ্ত সম্মানিত চেয়ারম্যান থেকে যেন দেশের পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান (রাষ্ট্রপতি) হয়ে দেশ ও জাতিকে শান্তির পথ প্রদর্শন করতে পারেন। কর্মফল আমাদের চিন্তাভাবনার ওপর নির্ভরশীল। ভালো চিন্তা করলে ভালো এবং খারাপ চিন্তা করলে খারাপ ফল আসে। কারণ সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টির কল্যাণ চান। আমাদের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত অন্যের কল্যাণ চিন্তাসহ সুখে থাকা, অনিষ্ট কামনা নয়।
লেখক : আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক
