বিয়ের প্রথম বছরেই গর্ভধারণ করেন তিন-চতুর্থাংশ নারী

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৭:৪৪ এএম

বিয়ের প্রথম বছরে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ নারীর গর্ভধারণের তথ্য উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)-এর এক গবেষণায়। অথচ অনেক নারী, বিশেষ করে শহরের বস্তিতে বসবাসকারী নারীরা, কিছুটা দেরিতে সন্তান নিতে চেয়েছিলেন। প্রায় অর্ধেক নারীর গর্ভধারণ-ই ছিল অনিচ্ছাকৃত বা সময়ের আগেই। এই গবেষণায় দাম্পত্য সহিংসতার উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীদের পাঁচজনের মধ্যে চারজনই বিয়ের ছয় মাসের মধ্যেই স্বামীর নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন। দুবছরে অর্ধেকের বেশি নারী আর্থিক সহিংসতা এবং উল্লেখযোগ্য অংশ মানসিক, শারীরিক ও যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

গতকাল বুধবার রাজধানীর আইসিডিডিআর,বির সাসাকাওয়া অডিটোরিয়ামে এক অনুষ্ঠানে গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়। ‘বাংলাদেশের নির্বাচিত গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলে নববিবাহিত দম্পতিদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার’ বিষয়ক এই গবেষণাটি কানাডার গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের অর্থায়নে পরিচালিত হয়।

২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত এ গবেষণায় কক্সবাজারের চকরিয়া, চাঁদপুরের মতলব এবং ঢাকার মিরপুর ও কড়াইল বস্তি এলাকার ৬৬৬ নববিবাহিত দম্পতি অংশ নেন। প্রতি চার মাস অন্তর মোট ছয় দফায় তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

গবেষণায় ভুল সময়ে গর্ভধারণের উচ্চ হার ৪৭ শতাংশ রেকর্ড করা হয়েছে। গ্রামীণ অংশগ্রহণকারীদের তুলনায় শহুরে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ভুল সময়ে গর্ভধারণের সম্ভাবনা তিনগুণেরও বেশি ছিল। গবেষণার শেষে, ৭৩ শতাংশ নারী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছিলেন, বেশির ভাগই বিয়ের প্রথম বছরের মধ্যেই। যদিও ৬৮ শতাংশ শহুরে মহিলা গর্ভধারণের আগে কমপক্ষে দুবছর অপেক্ষা করতে পছন্দ করতেন, ৬৭ শতাংশ মহিলা সেই সময়ের মধ্যেই অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন।

গবেষণায় দেখা যায়, গ্রামীণ এলাকায় ৪৩ শতাংশ এবং শহরের বস্তি এলাকায় ৬৫ শতাংশ নারী ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে করছেন। বিয়ের প্রথম বছরের মধ্যেই প্রায় ৭৩ শতাংশ নারী গর্ভধারণ করছেন, যদিও শহরের অনেক নারী অন্তত দুবছর সন্তান নেওয়া পিছিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। প্রায় অর্ধেক গর্ভধারণ ছিল অনিচ্ছাকৃত বা সময়ের আগেই।

দাম্পত্য সহিংসতার চিত্র আরও ভয়াবহ। বিয়ের প্রথম ছয় মাসেই ৭৯ শতাংশ নারী স্বামীর নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের কথা জানান। দুবছরের মধ্যে ৫২ শতাংশ নারী আর্থিক সহিংসতা, ২৩ শতাংশ মানসিক নির্যাতন, ১৫ শতাংশ শারীরিক সহিংসতা এবং ১৪ শতাংশ যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। মাত্র ৪ শতাংশ নারী জানান, তারা কোনো ধরনের সহিংসতার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হননি।

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, বিয়ের পরপরই গ্রামে ৬০ শতাংশ এবং শহরে ৬৬ শতাংশ নারী পড়াশোনা বন্ধ করতে বাধ্য হন। স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির আপত্তি, সামাজিক রীতি, বাসস্থান পরিবর্তন এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতা এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। কর্মজীবনের ক্ষেত্রেও নারীদের ওপর পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ স্পষ্টভাবে প্রভাব ফেলছে।

ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানটি উদ্বোধন করেন অ্যাডসার্চের প্রকল্প সমন্বয়কারী এবং আইসিডিডিআরবি-এর সহযোগী বিজ্ঞানী আনিসউদ্দিন আহমেদ, এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন অ্যাডসার্চের প্রকল্প পরিচালক এবং সিনিয়র বিজ্ঞানী এমেরিটাস ড. শামস এল আরিফিন। আইসিডিডিআরবি-এর বিজ্ঞানী ড. আহমেদ এহসানুর রহমানের সঞ্চালনায় একটি প্যানেল আলোচনার মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি শেষ হয়।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিসিএসডিপি, ডিজিএফপি-এর লাইন ডিরেক্টর ড. মো. রফিকুল ইসলাম তালুকদার; ব্লুমবার্গ ডেটা ফর হেলথ ইনিশিয়েটিভের স্বাস্থ্য খাত উন্নয়ন উপদেষ্টা ড. শাহ আলী আকবর আশরাফি; ওজিএসবির প্রাক্তন সভাপতি অধ্যাপক সামিনা চৌধুরী; এবং ইউএনএফপিএ বাংলাদেশের এইচআইভি, এসটিআই এবং এইচজিবিভি-এর টেকনিক্যাল অফিসার ড. রোখসানা ইয়াসমিন। গবেষণাটি পরিচালনা করেন অ্যাডসার্চের থিম লিড ড. ফৌজিয়া আখতার হুদা।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, পারিবারিক ও সামাজিক চাপ প্রায়শই নারীদের খুব অল্প বয়সে গর্ভবতী হতে বাধ্য করে, যা তাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। তিনি তরুণীদের জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করার এবং জন্মের ব্যবধান এবং গর্ভনিরোধক পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতনতা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন, উল্লেখ করে যে স্থানীয় সম্প্রদায়ের সদস্যরা এই প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।

অল্প বয়সে সন্তান ধারণকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে ডা. মো. রফিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ‘পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর বর্তমানে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কিশোর স্বাস্থ্য কর্মসূচি এবং স্কুল স্বাস্থ্য কর্মসূচিসহ বেশ কয়েকটি উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।’ তিনি আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ধরনের সচেতনতামূলক প্রচারণা আরও বৃহত্তর পরিসরে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত