ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজার ভেজাল খেজুর গুড়ে সয়লাব। চিনি আর বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের সংমিশ্রণে এসব খেজুর গুড় তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খেজুর গুড়ে রঙ, হাইড্রোজ, সোডা, ফিটকারির মতো ভেজাল মিশ্রণ করলে খাদ্যনালিতে ক্যানসার, কিডনি ড্যামেজ, লিভারের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে বলে স্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্টদের অভিমত।
জানা যায়, গুড় প্রস্তুতকারকরা বাড়তি লাভের আশায় এবং শীত মৌসুমে চাহিদা বেশি থাকায় চিনির সঙ্গে কেমিক্যাল মিশিয়ে খেজুর গুড় তৈরি করছেন। এসব গুড় বাজারে কেজিপ্রতি ১৫০-২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর কেজিপ্রতি ৩০০-৪০০ টাকায় বিক্রি হওয়া গুড়ে খেজুর রস অথবা ঝোলা গুড়ের সংমিশ্রণ থাকে। উপজেলার অধিকাংশ হাটবাজারেই এসব গুড় দেদার বিক্রি করা হচ্ছে। আসাধু গুড় ব্যবসায়ীরা বাজার থেকে কমদামে নিম্নমানের ঝোলা ও নরম গুড় কিনে তাতে চিনি, রঙ, হাইড্রোজ, সোডা, ফিটকারি মিশিয়ে গুড় তৈরি করছেন। তবে খেজুর গাছ কাটার কাজে নিয়োজিত ‘গাছি’র বাড়ি থেকে কেউ কেউ খেজুর গুড় সংগ্রহ করছেন। এসব গুড় গুণগত মানে উৎকৃষ্ট তবে দুষ্প্রাপ্য। আবার দামও চড়া। কেজিপ্রতি এসব গুড়ের দাম ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা। দামের আধিক্যের কারণে এই গুড় সাধারণের নাগালের বাইরে।
পৌরসভার গুড় বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মানভেদে প্রতি কেজি খেজুর গুড় ১৫০-২৫০ টাকা ও ঝোলাগুড় ১০০-১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গুড় উৎপাদনকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কার্তিক মাসের মধ্যভাগ থেকে চৈত্রমাসের প্রথম সপ্তাহ জুড়ে খেজুর গুড় উৎপাদন হয়ে থাকে। তাদের ভাষ্যমতে, বোয়ালমারী উপজেলায় আর আগের মতো খেজুর গাছ নেই। এ জন্য সংরক্ষণের তুলনায় খেজুর রসের চাহিদা বেশি। প্রতি ৮-১০ লিটার খেজুর রসে এক কেজি গুড় উৎপাদন হয়ে থাকে। প্রতিকেজি গুড় উৎপাদনে জ্বালানি, মজুরিসহ খরচ হয় ৩০০-৩৫০ টাকার মতো। পক্ষান্তরে ১০ লিটার রসের সঙ্গে দুই কেজি চিনি মেশালে গুড় বেড়ে হয় দ্বিগুণ। চিনি বা অন্য কোনো ভেজাল দ্রব্য না মেশালে গুড় উৎপাদনকারীদেরই বিক্রি করতে হবে প্রতিকেজি কমপক্ষে ৫০০ টাকা করে। ক্রেতাদের হাতে এসব গুড় পৌঁছানোর আগেই পাইকার আর ক্ষুদ্র দোকানদারদের হাতবদল হয়। উভয়ের লাভ শেষে প্রতিকেজি খেজুর গুড় বিক্রি করতে হয় ৬০০-৭০০ টাকায়। কিন্তু এই টাকায় গুড় কেনার ক্রেতা খুব বেশি নেই। তাই চিনি এবং ঝোলা গুড় মিশিয়ে গুড়ের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখা হচ্ছে। গুড়ের রঙ ফর্সা ও শক্ত করতে চিনি মেশাতে বাধ্য হন বলে জানান তারা। চিনি মেশানো এই গুড়ে প্রকৃত স্বাদ-গন্ধ থাকে না। চিনিমুক্ত গুড়ের রঙ হয় কালো। তাতে প্রকৃত স্বাদ-গন্ধ অটুট থাকে।
বোয়ালমারী প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন জানান, ফরিদপুরের খেজুর গুড়ের সেই ঐতিহ্য আজ আর নেই। গুড় উৎপাদনকারীরা ভেজাল গুড় তৈরি করছেন। ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (ডিসিপ্লিন) ডা. খালেদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানান, খেজুর গুড়ে চিনি, রঙ, হাইড্রোজ, সোডা, ফিটকারির মতো ভেজাল মিশ্রণ করলে খাদ্যনালিতে ক্যানসার, কিডনি ড্যামেজ, লিভারের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই তিনি ভেজাল গুড় না কেনার জন্য ক্রেতাদের আহ্বান জানিয়েছেন।
জানতে চাইলে বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম রকিবুল হাসান বলেন, খেজুর গুড়ে ভেজাল প্রতিরোধে শিগগিরই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মতো আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
