২০ ডিসেম্বর নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে পর্দা নেমেছে প্রথম নারী সাফ ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপের। পাঁচ দলের আসরে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন ভারতের ইস্ট বেঙ্গল। ফাইনালে তারা উড়িয়ে দিয়েছে স্বাগতিক আর্মড পুলিশ ফোর্সকে। অথচ চিত্রনাট্যটা অন্যরকম হতে পারত। সেরার লড়াইয়ে থাকতে পারত বাংলাদেশের নাসরিন স্পোর্টস অ্যাকাডেমি। তবে মর্যাদার এ আসর থেকে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নরা ফিরেছেন সবার নিচে শেষ করার লজ্জা সঙ্গী করে। দক্ষিণ এশিয়ার টানা দুই বারের সেরা বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে এক ম্যাচও জিততে পারেননি সানজিদা আক্তাররা। উল্টো ভারত ও নেপালের মতো শক্ত প্রতিপক্ষের কাছে নাস্তানাবুদ হয়ে এবং অনেক পিছিয়ে থাকা পাকিস্তান ও ভুটানের দুই ক্লাবের সঙ্গে কোনোমতে ড্র করে নিজেদের মলিন রূপে হাজির হয়েছে। ব্যর্থতায় স্বাভাবিকভাবেই উঠছে প্রশ্ন এর দায় কি শুধুই নাসরিনের কর্তাদের। নাকি দায়টা দেশের সামগ্রিক ফুটবল সিস্টেমের?
এ বছর এখনো মাঠে গড়ায়নি নারী ফুটবল লিগ। গত বছর নাসরিন এসসি সেরা হয়েছিল দেশসেরা সব ফুটবলারকে নিয়ে। ঘটনাচক্রে নিম্নমানের দল থেকে হুট করেই সেবার সেরা দলে রূপ নিয়েছিল তারা। আগের তিন লিগের চ্যাম্পিয়ন বসুন্ধরা কিংস দল গড়বে বলে জাতীয় দলের বেশিরভাগ ফুটবলার দলবদলে অন্য কোনো দলে যাননি। তবে শেষ মুহূর্তে বসুন্ধরা দল গঠন না করায় বিপাকে পড়ে যান ২০২৪ সাফজয়ী দলের ৯০ ভাগ সদস্য। বাফুফের নারী ফুটবল কমিটির প্রধান মাহফুজা আক্তার তড়িঘড়ি নাসরিন অ্যাকাডেমিকে দিয়ে সেই ফুটবলারদের চুক্তিবদ্ধ করান। অনেকটা পেটে-ভাতেই দেশসেরারা নাম লেখান নাসরিনে এবং শেষ পর্যন্ত দলটি লিগ শিরোপাও ঘরে তোলে।
এবার যখন সাউথ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশন নারী ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপের ঘোষণা দেয়, তখন সেই সেরারাই স্বপ্ন দেখেছিলেন আরেকবার কাঠমান্ডু জয়ের। তবে বাধ সাধেন জাতীয় দলের ব্রিটিশ কোচ পিটার বাটলার। এশিয়ান কাপকে সামনে রেখে অনুশীলনে থাকা জাতীয় দলের ফুটবলারদের সাফের আসরে খেলার অনুমতি দেননি তিনি। আবার বয়সভিত্তিক ফুটবলারদের ছাড়পত্র দিয়েছেন কঠিন এক শর্তে। তার সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে জাতীয় দল থেকে ছিটকে যাওয়া ছয় সিনিয়র ফুটবলারের সঙ্গে ক্যাম্পের তরুণ ফুটবলাররা যাতে নাসরিনে না খেলে, সে শর্ত জুড়ে দেন বাটলার। জাতীয় দলের কোচের এ অযাচিত হস্তক্ষেপ মুখ বুঝে সহ্য করেছেন নারী ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার। তার আজ্ঞাবহ নাসরিনের কর্তারা প্রাথমিক আলোচনায় রেখেও শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত দলে সাবিনা খাতুন, মাসুরা পারভীন, কৃষ্ণারানী সরকার, মাতসুশিমা সুমাইয়া, নিলুফা ইয়াসমিন নিলাদের মতো পরীক্ষিতদের রাখার ব্যাপারে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। ক্লাব কর্তাদের অনিচ্ছা, বাটলারের শর্ত আর জাতীয় দলের সেরারা না খেলায় এক সময় সাবিনারাও হাল ছেড়ে দেন।
৫ ডিসেম্বর কাঠমান্ডুতে শুরু হওয়া ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপে নাসরিন যায় এক অনভিজ্ঞ দল নিয়ে। সে দলের নেতৃত্বে ছিলেন বাজে ফর্মের কারণে জাতীয় দল থেকে ছিটকে যাওয়া সানজিদা আক্তার। অনূর্ধ্ব-১৭ ও অনূর্ধ্ব-২০ দলের দ্বিতীয় সারির ফুটবলারদের নিয়ে গড়া সে দল শুরুর ম্যাচেই নেপালের এপিএফ দলের কাছে ধরাশায়ী ৪-০ গোলে। পরের ম্যাচে পাকিস্তানের করাচি সিটির সঙ্গে গোলশূন্য ড্র। তৃতীয় ম্যাচে ভারত জায়ান্ট ইস্ট বেঙ্গলের কাছে হারে ৭-০ ব্যবধানে। আর লিগপর্বের শেষ ম্যাচে নাসরিন ১-১ ড্র করে ভুটানের ট্রান্সপোর্ট ইউনাইটেডের সঙ্গে। চার ম্যাচ থেকে নাসরিনের সংগ্রহ স্রেফ দুই পয়েন্ট। এক গোল করার বিপরীতে হজম করে ১২ গোল। তাই সমান পয়েন্ট সত্ত্বেও গোলের হিসাবে নাসরিনকে ছাপিয়ে পাঁচ দলের তালিকায় চতুর্থ হয় পাকিস্তানের করাচি সিটি। নাসরিনের তলানির দল হিসেবে শেষ করাটা বাংলাদেশের জন্য বড় লজ্জার। ইস্ট বেঙ্গলের কাছে বড় হারে বিদায়ের পর অধিনায়ক সানজিদা আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘দলে তো আমি ছাড়া জাতীয় দলে খেলা অভিজ্ঞ খেলোয়াড় নেই। তার ওপর সবার প্রস্তুতি ঠিকমতো হয়নি। ইস্ট বেঙ্গল সবচেয়ে শক্তিশালী দল। তাদের হয়ে উগান্ডা, ঘানা ও নাইজেরিয়ার খেলোয়াড়রা খেলেছে। এ ছাড়া ভারত জাতীয় দলেরও কয়েকজনকে দেখেছি। আমাদের খেলোয়াড়রা তাই বুঝে উঠতে পারছিল না সবকিছু। এভাবে হলে আসলে না খেলাই উচিত। যথেষ্ট প্রস্তুতি এবং আরও ভালো খেলোয়াড় নিয়ে আসা উচিত ছিল।’
সেরাদের নিয়ে খেললে আজ হয়তো আরেকটা সাফল্যের পালক যুক্ত হতো দেশের নারী ফুটবলের মুকুটে। বাটলারের জেদ আর বাফুফে কর্তাদের অবহেলায় নাসরিন ব্যর্থ হয়েছে। তাতে বাংলাদেশের সম্মানহানি ঘটেছে সেই দশরথ রঙ্গশালাতেই, যেখানে ২০২২ ও ২০২৪ সালে ইতিহাস গড়েছিল এ দেশের নারীরা।
