লালমনিরহাটে শীতের কাছে পরাজিত মানুষের দিন

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৭:৪৯ এএম

ভোর হওয়ার কথা ছিল আলো দিয়ে। কিন্তু লালমনিরহাটে ভোর আসে ধূসর কুয়াশা নিয়ে। জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া ঠান্ডা হাওয়া ঘুম ভাঙিয়ে দেয় আগেই। উঠানে পা রাখলেই পায়ের নিচে ভেজা মাটি, বাতাসে কনকনে শীত মনে হয় যেন পুরো জনপদ থমকে আছে এক সাদা নীরবতার ভেতর। সূর্য কোথাও নেই, শুধু ঠান্ডা আর অপেক্ষা। এই কুয়াশার ভেতরই প্রতিদিন নতুন করে বাঁচার লড়াই শুরু করেন লালমনিরহাটের মানুষ। বিশেষ করে নদী তীরবর্তী চরাঞ্চল আর প্রান্তিক গ্রামগুলোতে শীত মানেই অসহায়তার আরেক নাম।

রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র জানিয়েছেন, গতকাল সকাল ৬টায় লালমনিরহাটে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মহিষখোচা ইউনিয়নের গোবর্ধন এলাকার হাসান আলী (৬৫) বলেন, ‘জারোতে হাত-ঠাংগুলা ছ্যাংগা ধরে। রাইতে ঠিকমতো ঘুম আইসে না। এত ঠান্ডায় নদী পাড়ের মানুষ কোটনে যাইবে?’

শীতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রোগবালাইও। জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে বাড়ছে শিশু ও বয়স্ক রোগীর সংখ্যা। সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন অনেকে। তবে দরিদ্র পরিবারগুলোর অনেকেরই ওষুধ কেনার সামর্থ্য নেই। হাতীবান্ধা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. আনারুল হক বলেন, শীতকালে শিশু ও বয়স্কদের সুরক্ষায় বাড়তি সতর্কতা জরুরি। ঠান্ডা ও কুয়াশা এড়িয়ে চলতে হবে এবং অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।

‘শীতের ঠ্যালায় ঘর থাকি বাইরা বের হওয়া যায় না। বাইরা বের হইলে বাতাস গাত ফোরে-ফোরে ঢোকে।’ কথাগুলো বলছিলেন আদিতমারী উপজেলার ভাদাই গ্রামের কৃষক নজু মিয়া (৫৫)। কাঁপতে থাকা হাত দুটো ঘষে ঘষে যেন শরীরে একটু উষ্ণতা ফেরানোর চেষ্টা করছিলেন।

পৌষের ১০ দিন যেতে না যেতেই হাড় কাঁপানো কনকনে ঠান্ডা আর ঘন কুয়াশায় লালমনিরহাটের জনজীবন কার্যত স্থবির। টানা দুদিন সূর্যের দেখা নেই। রাতে কুয়াশা ঝরছে বৃষ্টির মতো। উত্তরের হিমেল বাতাসে জবুথবু হয়ে পড়ছে গ্রাম থেকে শহর সবখানেই। আর চরাঞ্চলে শীত মানেই জীবন থমকে যাওয়া আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা তিস্তা নদীর চর। এখানে শীত যেন আরও নির্দয়। খোলা প্রান্তর, নদীর হাওয়া আর কুয়াশার ভেজা ঠান্ডা একসঙ্গে মানুষের শরীর আর মন দুটোই কাঁপিয়ে দিচ্ছে।

চরের বাসিন্দা আবেদুল ইসলাম (৬৫) বলেন, ‘ঠান্ডায় আর জীবন চলে না বাহে। জমির কাজ ঠিকমতো করতে পারছি না। আলু ক্ষেতে পানি দেওয়া দরকার, কিন্তু এই ঠান্ডায় শরীর সায় দেয় না।’

চরের অনেক ঘরেই নেই পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র। রাতে আগুন জ্বালিয়ে, খড়কুটো জড়ো করে কিংবা একখানা কম্বল ভাগাভাগি করে রাত কাটে পুরো পরিবারের। শিশু আর বয়স্কদের চোখেমুখে ক্লান্তি আর ভয় এই শীত কতটা সহ্য করা যাবে?

শীতের সঙ্গে সঙ্গে কমে গেছে কাজের সুযোগ। দিনমজুরদের অনেকেই সকালে কাজের আশায় বের হয়েও ফিরে যাচ্ছেন খালি হাতে। আদিতমারী বাজারের রিকশাচালক এমদাদুল হক বলেন, ‘রিকশার হাতলে হাত রাখা যায় না। হাত-পা নিস্তেজ হয়ে যায়। খুব কষ্টে একবেলা রিকশা চালাই। আয়ও কমে গেছে।’ ঘন কুয়াশায় যান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় পরিবহন শ্রমিকদের দুর্ভোগও বাড়ছে। লালমনিরহাট ট্রাকস্ট্যান্ডের ট্রাকচালক রজব আলী জানান, ‘রাতে গাড়ি চালানো যায় না। দিনের বেলাতেও হেডলাইট জ্বালিয়ে ধীরে চালাতে হয়।’

রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র আরও জানিয়েছেন ‘আগামী কয়েক দিনে তাপমাত্রা আরও কমতে পারে।’

এই শীতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু ও বয়স্করা। অনেক দরিদ্র পরিবারে পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র নেই। কুয়াশার চাদরে ঢাকা লালমনিরহাটে তাই প্রতিদিনের গল্প একটাই শীতের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার গল্প, একটু উষ্ণতার অপেক্ষায় থাকা মানুষের দীর্ঘশ্বাস।

হিমেল বাতাস আর কুয়াশায় শীতে কাঁপছে  চুয়াডাঙ্গা : ঘন কুয়াশা আর হিমেল বাতাসে কাঁপছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্জলের সীমান্তবর্তী জেলা চুয়াডাঙ্গা। কয়েকদিন ধরেই এই জেলায় সকাল-সন্ধায় তাপমাত্রার তারতম্য বেশি অনুভূত হচ্ছে। মেঘলা আকাশ, ঘন কুয়াশা ও হিমেল বাতাসে জেলায় শীতের তীব্রতা বেড়েছে।

দিনভর রোদের অভাবে জনজীবনে নেমে এসেছে তীব্রতা। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন ছিন্নমূল মানুষ খেটে খাওয়া শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী। গতকাল শুক্রবার সকাল ৯টায় চুয়াডাঙ্গায় সবনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯৫ শতাংশ।

চুয়াডাঙ্গা জেলা আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, গত কয়েকদিন ধরে জেলার তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে কমছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত