মাটির স্পর্শে বেঁচে আছে প্রাণের শিল্প

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:২৫ এএম

সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত এক জনপদ বেহেলী ইউনিয়নের বদরপুর গ্রাম। হাওরের কোলঘেঁষা এই গ্রামটি ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে উন্নত সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা থেকে আজও অনেকটা বিচ্ছিন্ন। বর্ষায় যখন চারপাশ অথৈ জলে ডুবে যায়, তখন গ্রামটি রূপ নেয় এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপে। আবার শুষ্ক মৌসুমেও মাইলের পর মাইল কর্দমাক্ত মাটির পথ পেরিয়ে সেখানে পৌঁছানো বেশ কষ্টসাধ্য। তবে আধুনিক নাগরিক সুবিধা পৌঁছাতে দেরি হলেও এই গ্রামটিতে পরম মমতায় টিকে আছে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প।

এই গ্রামের বিশেষত্ব হলো এর মৃৎশিল্পের কারিগররা। যুগ যুগ ধরে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এই শিল্পের চাকা সচল রেখেছেন গ্রামের নারীরা। অভাব-অনটন আর যোগাযোগব্যবস্থার প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তারা আগলে রেখেছেন তাদের পূর্বপুরুষদের এই পেশাকে। তাদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হয় কলস, হাঁড়ি, সরা, থালা ও পেয়ালা, মাটির পুতুল, শিশুদের খেলনা সামগ্রী।

হাওরের বিশেষ এক ধরনের মাটিই এই শিল্পের প্রধান কাঁচামাল। কারিগররা হাওর থেকে বিশেষ মাটি সংগ্রহ করে প্রথমে তা রোদে শুকান। এরপর মাটি থেকে ময়লা ও কণা পরিষ্কার করে তা পণ্য তৈরির উপযোগী করেন। কয়েক ধাপের প্রক্রিয়াজাতকরণের পর মাটি যখন নমনীয় হয়, তখন কারিগররা তাদের শৈল্পিক হাতের জাদুতে সেটিকে কলস, থালা বা পুতুলের রূপ দেন। আকার দেওয়ার পর পণ্যগুলো কড়া রোদে শুকানো হয়। সবশেষে মাটির এই কাঁচা রূপকে স্থায়িত্ব দিতে আগুনের চুল্লিতে পোড়ানো হয়। আগুনে পোড়ানোর পরেই তা ব্যবহারের উপযোগী ও টেকসই হয়ে ওঠে।

গ্রামের প্রবীণ মুরব্বি মিলন চন্দ্র পাল জানান, এক সময় হাওরাঞ্চলে মাটির হাঁড়ি, পাতিল, কলস, সরা ও পুতুলের ব্যাপক চাহিদা ছিল। সেই সময় মৃৎশিল্পই ছিল ঘরোয়া ব্যবহারের প্রধান উপকরণ। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামে গ্রামে সিলভার ও প্লাস্টিকের পণ্যের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় এই শিল্প এখন হারিয়ে যাওয়ার মুখে। তবুও পূর্বপুরুষের পেশা আঁকড়ে ধরে নারীরা এখনো টিকিয়ে রেখেছেন শত বছরের এই ঐতিহ্য। তবে এখন সমস্যা বেড়েছে, উৎপাদনেও খরচ বেড়েছে। হাওরে বিশেষ ধরনের মাটি পাওয়া গেলেও আগুনে পোড়ানোর জন্য আগের মতো জ্বালানি কাঠ আর পাওয়া যায় না। এতে বাধ্য হয়ে বাজার থেকে লাকড়ি কিনতে হচ্ছে তাদের। প্রতিটি পণ্যের উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় বেড়ে গেছে, অথচ বাজারে সেই অনুযায়ী দাম মিলছে না। এ কারণে পরিশ্রমের তুলনায় লাভ কম পেয়ে হতাশ হয়ে পড়ছেন মৃৎশিল্পীরা। তবুও গ্রামের নারীরা আশা ছাড়েননি। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে আবারও এই শিল্প ফিরে পাবে তার পুরনো দিন।

স্থানীয় মৃৎশিল্পী রিতা রানী পাল বলেন, ‘আমার দিদিমারা এই কাজ করতেন। পরে মা করেছে, এখন আমরা করছি। এক সময় বদরপুর গ্রামে প্রায় সব বাড়িতেই মাটির হাঁড়ি-পাতিল তৈরি হতো। এখন সংখ্যায় কমে গেলেও কিছু পরিবার এখনো এই কাজে জড়িত। পুরুষরা হাওর থেকে মাটি সংগ্রহ করে দিলে পণ্য তৈরি করেন নারীরাই। মৃৎশিল্পের পণ্যগুলো স্থানীয় বাজারে বিক্রি হলেও বর্তমানে দাম কমে যাওয়ায় আগের মতো লাভ নেই।’

গ্রামের আরেক মৃৎশিল্পী শুভা রানী বলেন, ‘আগে মানুষের ঘরে ঘরে মাটির হাঁড়ি-পাতিল ছিল। এখন সবাই স্টিল আর প্লাস্টিকের জিনিস ব্যবহার করে, এ জন্য চাহিদা কমেছে। একই সঙ্গে দামও কমেছে। তবুও উৎসব বা বিশেষ অনুষ্ঠান এলেই আমাদের পণ্য লাগে। মেলায় মাটির পুতুলের চাহিদা থাকে। অন্যসময় মাছ ধরার জালের কটি’র চাহিদা থাকে। পাতিল এবং সরাও সামান্য পরিমাণে বিক্রি হয়।’

মৃৎশিল্পী শ্যামল পাল বলেন, ‘বাচ্চাদের খেলনার চাহিদা রয়েছে। বড়-ছোট অনুযায়ী দাম নির্ধারণ হয়। হাঁড়ি-পাতিলও একেকটি একেক দামে বিক্রি করা যায়। মানুষের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে বিক্রি করতে হয়। কোথাও মেলা হলে সেখানেও বিক্রি করা যায়।’

সুনামগঞ্জ বিসিকের উপব্যবস্থাপক এম এন এম আসিফ বলেন, ‘জেলার জামালগঞ্জ, শান্তিগঞ্জসহ আরও কয়েকটি উপজেলায় মৃৎশিল্পের নানা ধরনের পণ্য উৎপাদিত হয়ে আসছে। এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কারিগররা বংশপরম্পরায় এ পেশাকে ধারণ ও লালন করে যাচ্ছেন। মৃৎশিল্পের যেমন অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে, তেমনি রয়েছে ঐতিহ্যগত মূল্য।’ তিনি আরও বলেন, প্লাস্টিক পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পড়ায় বর্তমানে মৃৎশিল্পীরা আগের মতো লাভবান হতে পারছেন না। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিসিক তাদের প্রযুক্তিগত উন্নয়নে কাজ করছে। পাশাপাশি বিপণনের সুযোগ বাড়াতে বিসিকের অনলাইন ডাটাবেজে মৃৎশিল্পীদের অন্তর্ভুক্ত করার কার্যক্রম চলছে। এর ফলে সারা দেশের ক্রেতারা সরাসরি মৃৎশিল্পীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পণ্য ক্রয় করতে পারবেন। এছাড়াও কেউ আর্থিক সহযোগিতা চাইলে যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে সহায়তা প্রদানের সুযোগ রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত