পূর্ব আফ্রিকার ব্রিটিশ শাসিত একটি অঞ্চল আজকের সোমালিল্যান্ড। ১৯৯১ সালে যখন সোমালিয়ায় বিধ্বংসী গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, তখন এই অঞ্চলটি নিজেদের স্বাধীন ঘোষণা করে। এরপর থেকে গত ৩৪ বছর ধরে তারা কার্যত একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মতো পরিচালিত হয়ে আসছে। তাদের নিজস্ব মুদ্রা, পতাকা, সংসদ এবং গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থা রয়েছে। গত শুক্রবার বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে সোমালিল্যান্ডকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ইসরায়েলের কাছ থেকে এই স্বীকৃতি পাওয়ার পর হঠাৎ করেই বিশ্ব রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অপেক্ষায় থাকা ‘হর্ন অব আফ্রিকা’ খ্যাত অঞ্চলের ভূখণ্ড সোমালিল্যান্ড। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা করেছেন যে, ইসরায়েল ও সোমালিল্যান্ড পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছে। এই পদক্ষেপকে ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর প্রতিফলন দাবি নেতানিয়াহুর। তবে বিশ^ সম্প্রদায় বলছে পরিকল্পিতভাবে ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করার নীল নকশা।
প্রতিবেশী দেশগুলোতে বিশৃঙ্খলা থাকলেও সোমালিল্যান্ড তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। তবে সমস্যা হলো, জাতিসংঘ বা অন্য কোনো দেশ গত তিন দশক ধরে তাদের এই স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়নি। সোমালিয়া সরকার সবসময়ই সোমালিল্যান্ডকে তাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দাবি করে আসছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের এই স্বীকৃতির পেছনে গভীর কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ কাজ করছে। মোটা দাগে তাদের প্রধানত তিনটি স্বার্থ থাকতে পারে সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতিদানের পেছনে।
লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ : সোমালিল্যান্ডের ভৌগোলিক অবস্থান এডেন উপসাগর এবং লোহিত সাগরের সংযোগস্থলে। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ওপর নজরদারি এবং তাদের অস্ত্র সরবরাহ বন্ধে সোমালিল্যান্ডের ভূমি ইসরায়েলের জন্য ‘ফরোয়ার্ড বেজ’ হিসেবে কাজ করবে।
আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের সম্প্রসারণ : সংযুক্ত আরব আমিরাত যারা ইতিপূর্বে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে সোমালিল্যান্ডের বারবেরা বন্দরে একটি সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা করে। ইসরায়েলের এই স্বীকৃতি মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় তাদের মিত্রদের প্রভাব আরও শক্তিশালী করবে।
বিতর্ক ও ফিলিস্তিন ইস্যু : সোমালিল্যান্ডের এই স্বীকৃতি নিয়ে একটি বড় বিতর্কও তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বেশ কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জাতিগতভাবে নির্মূল করে তাদের আফ্রিকান এই অঞ্চলে, অর্থাৎ সোমালিল্যান্ডে স্থানান্তরের একটি বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ এই স্বীকৃতি। যদিও মিসর এবং জিবুতির মতো দেশগুলো এই ধরনের যেকোনো পরিকল্পনার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
সোমালিয়া ও আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিবাদ : ইসরায়েলের এই ঘোষণায় সোমালিয়া সরকার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তারা বিষয়টিকে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর একটি ‘সরাসরি আক্রমণ’ এবং ‘অবৈধ পদক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেছে। কেবল সোমালিয়া নয়, আরও বেশ কয়েকটি পক্ষও এই স্বীকৃতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আফ্রিকান ইউনিয়ন এই পদক্ষেপকে প্রত্যাখ্যান করে সতর্ক করেছে যে, এটি আফ্রিকার অন্য দেশের সীমানা এবং স্থিতিশীলতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। মিসর ও তুরস্ক জানিয়েছে, কোনো সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এমন হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি। তুরস্কের মতে, এটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের পথকে বাধাগ্রস্ত করার একটি সুদূরপ্রসারী কূটকৌশল।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান : সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন দ্বিধাবিভক্ত বলে জানা গেছে। সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি প্রদানের বিরোধিতা করে নিউ ইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, কেউ কী জানেন সোমালিল্যান্ড আসলে কী? কারও কারও আশঙ্কা- সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দিলে সোমালিয়ার সঙ্গে সামরিক সম্পর্কের অবনতি ঘটবে এবং সার্বিকভাবে সোমালিয়া-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্র সৈন্য মোতায়েন করেছে, জঙ্গিগোষ্ঠী আল-শাবাবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সোমালি বাহিনীকে সহায়তা করে তারা। তবে ট্রাম্প প্রশাসনে সোমালিল্যান্ডের পক্ষে কথা বলছেন এমন প্রভাবশালী ব্যক্তিও আছেন। রিপাবলিকান পার্টির প্রভাবশালী নেতা সিনেটর টেড ক্রুজ সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন। পাশাপাশি তিনি সোমালিল্যান্ড ও ইসরায়েলের মধ্যে গভীর সম্পর্ক স্থাপনের পক্ষেও সোচ্চার।
জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ইসরায়েলই প্রথম স্বাধীন দেশের স্বীকৃতি দিল সোমালিল্যান্ডকে। বিষয়টি সোমালিল্যান্ডের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হলেও, এই স্বীকৃতিতে পুরো ‘হর্ন অব আফ্রিকা’ অঞ্চলে নতুন উত্তেজনার পথও বিস্তৃত হলো বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
