গানম্যান-অস্ত্রে শৃঙ্খলা নিয়ে সংশয়

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৭:২৫ এএম

মগবাজার ফ্লাইওভার থেকে ছোড়া ককটেলের বিস্ফোরণে গত ২৪ ডিসেম্বর ঘটনাস্থলেই নিহত হন সিয়াম (২১) নামে এক যুবক। ওই ঘটনায় মামলা হলেও এখনো কাউকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এর আগে গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় দিনদুপুরে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়। পরে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন মূল আসামি ভারতে পালিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ছাড়া হাদির মরদেহ যেদিন দেশে আসে, সেদিনই দেশের অন্যতম দুই সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলা হয়। সেই রাতেই হামলার শিকার হয় সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটও।

গত কয়েক দিনের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে তাদের আরও সতর্ক ও সক্রিয় হওয়ার কথা বলছেন বিশ্লেষকরা। সরকার ইতিমধ্যে রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিকসহ কিছু ব্যক্তিকে গানম্যান দেওয়ার পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব পদক্ষেপে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নতি হয়নি। অস্ত্রের লাইসেন্স বা গানম্যান দিয়ে শৃঙ্খলা ফেরানোর বিষয়েও তাদের সংশয় রয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এমন অবস্থাকে সরকারের ব্যর্থতা বলে মনে করছেন তারা।

গত ১৩ ডিসেম্বর আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কোর কমিটির বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, যারা আসন্ন নির্বাচনে অংশ নেবেন, তারা যদি আগ্নেয়াস্ত্র চান, তাদের লাইসেন্স দেওয়া হবে। এ ছাড়া নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া প্রার্থীদের যেসব আগ্নেয়াস্ত্র সরকারের কাছে জমা ছিল, সেগুলো ফেরত দেওয়া হবে। লুট হওয়া ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেইজ-২’ চালুর পাশাপাশি সারা দেশে সব নির্বাচন অফিস এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয়-সংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন এবং রিটার্নিং অফিসারদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার জন্য গানম্যান নিয়োগের ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানান তিনি। এরপরও নানা ধরনের সহিংসতা থেমে নেই। ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিনিয়ত সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। কোনো কোনো স্থানে ঘটনার সঠিক তথ্যও দেয় না থানা-পুলিশ। আবার অনেক ঘটনা নথিভুক্তই হয় না। এমন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে যৌথবাহিনীর অভিযান, আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া এবং গানম্যান নিয়োগ দিয়ে কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে দেশের শৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, ককটেল নিক্ষেপ, অগ্নিসংযোগ ও সড়ক অবরোধের মতো ঘটনাগুলো জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। দেশের এমন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা ভালো না হলে অনেকেই ভোটকেন্দ্রে যাবেন না বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন।

পুলিশ, হাসপাতাল ও মানবাধিকার সংগঠন সূত্রে জানা যায়, দেশে গত ১৫ মাসে (২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত) রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৮২ জন খুন হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ১১৭ জন ও আওয়ামী লীগের ৪৬ জনসহ অন্যান্য সংগঠনের নেতাকর্মী রয়েছেন। এক হাজারের বেশি ঘটনায় এসব হত্যাকাণ্ড ঘটে। এতে প্রতি মাসে গড়ে ১২ জনকে হত্যা করা হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে একই ধরনের আট শতাধিক ঘটনায় অন্তত ১১৯ জন নিহত এবং ৭ হাজার ৪২ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া সামাজিক অস্থিরতাসহ অন্যান্য কারণেও হত্যার ঘটনা বাড়ছে। ফলে জনমনে আতঙ্ক বাড়ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ঢাকা, খুলনা ও চট্টগ্রামসহ সারা দেশে প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ড সামগ্রিকভাবে একটি বার্তাই দেয়দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বলতাকেই দায়ী করে তিনি বলেন, যে ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি থাকার কথা, অর্থাৎ যে ধরনের স্থিতিশীলতা প্রয়োজন, সেই জায়গাটা তৈরি হচ্ছে না। কখনো মনে হয়, পরিস্থিতি একটু ভালোর দিকে যাচ্ছে। কিছুদিন পরই আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসে। অর্থাৎ নতুন কোনো অস্থিরতা সৃষ্টি হলে সেটাকে দ্রুত মোকাবিলা করার সক্ষমতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে পুরোপুরি তৈরি হয়নি।

দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা বলেন, নির্বাচনকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা অসম্ভব কিছু নয়। তবে এর জন্য ঘটনা ঘটার আগেই বাহিনীগুলোকে তৎপর হতে হবে। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজনে প্রতিরোধমূলক আটকের ওপর জোর দিতে হবে।

তার মতে, আগাম তথ্য সংগ্রহ করা যায় এবং সম্ভাব্য অপরাধীদের ধরা যায় তাহলে অপরাধ কমে আসবে। এ ছাড়া দরকার হলে প্রতিরোধমূলক আটক করতে হবে এবং তারা যেন নির্বাচনের আগে বের হতে না পারে, সে চেষ্টা করতে হবে বলে মন্তব্য করেন সাবেক এই আইজিপি।

তুলনামূলকভাবে সার্বিক অপরাধ বাড়ছে উল্লেখ করে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. উমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই ঊর্ধ্বগতি শুধু পরিসংখ্যান নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতারও প্রতিফলন। ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়তে থাকলে মনে করতে হবে যে এখানে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা চলছে। সেই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা সমাজে এক ধরনের সহিংস পরিবেশ তৈরি করছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ : পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সুন্দর ও স্বাভাবিক রাখতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সেগুলো হলোঢাকায় এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় চেকপোস্ট বাড়ানো, টহল কার্যক্রম জোরদার করা। দ্বিতীয় ধাপে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নামে যৌথবাহিনীর অভিযান শুরু করা। এসব অভিযানে ইতিমধ্যে আটকের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থীদের জন্য অস্ত্রের লাইসেন্স ও গানম্যান নিয়োগের সুযোগ সহজ করা। সরকার ইতিমধ্যে এ জন্য নতুন নীতিমালা জারি করেছে। এসবের বাইরে নির্বাচনের জন্য পুলিশ সদস্যদের আলাদা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

নির্বাচনে দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে প্রকাশ্য গুলির ঘটনা : প্রকাশ্যে জনাকীর্ণ স্থানে গুলি করে হত্যার ঘটনা জাতীয় নির্বাচনে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিচ্ছে। অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, দুর্বল পুলিশিং এবং গত বছরের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মুক্তি পাওয়া শীর্ষ অপরাধীদের পুনরায় সক্রিয় হওয়ায় প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ড ঘটছে। টার্গেট কিলিংয়ের জন্য ভাড়া করা হচ্ছে শুটার। পরিকল্পিতভাবে হত্যার পর অনেকে আত্মগোপনে চলে যাচ্ছেন। এতে আসন্ন নির্বাচনে জনমনে ভয় সৃষ্টি হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এমন পরিস্থিতিতে ভোট দেওয়া তো দূরের কথা, বাসা থেকে বের হতেই ভয় পাচ্ছেন অনেকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত