আপসহীন সংগ্রামের মহাকাব্যিক সমাপ্তি

আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:২৫ এএম

৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫। বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশ থেকে খসে পড়েছে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। দীর্ঘ রোগভোগের পর গতকাল সকাল ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ৮০ বছর বয়সে তার মহাপ্রয়াণ শুধু একটি দলের নেতার বিদায় নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ, কণ্টকাকীর্ণ এবং আপসহীন সংগ্রামের মহাকাব্যের সমাপ্তি। তার প্রয়াণে দেশ জুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও শোকের বার্তা প্রবাহিত হচ্ছে। বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট (মতান্তরে ১৯৪৬)। এক শান্ত ও সুশৃঙ্খল পারিবারিক পরিবেশে বড় হওয়া এই মহীয়সী নারীর জীবন আমূল বদলে যায় ১৯৬০ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তরুণ অফিসার জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর। একজন সাধারণ গৃহবধূ হিসেবে জীবন শুরু করলেও, ইতিহাসের অমোঘ নিয়তি তাকে নিয়ে আসে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে দুই শিশুসন্তানসহ বন্দি জীবনের দুঃসহ স্মৃতি এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৭৫-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ফার্স্টলেডি হিসেবে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সংযত। তবে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে এক ব্যর্থ অভ্যুত্থানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বিএনপি অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। দলের ঐক্য এবং জিয়াউর রহমানের আদর্শকে সমুন্নত রাখতে তৃণমূল নেতাকর্মীদের চাপে ১৯৮২ সালে তিনি দলের হাল ধরেন। ১৯৮৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপি চেয়ারপারসন নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে শুরু হয় তার ‘দেশনেত্রী’ হয়ে ওঠার যাত্রা।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতির সমার্থক শব্দ হলো ‘আপসহীনতা’। আশির দশকে এইচ এম এরশাদের সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তার অবিচল অবস্থান তাকে গণমানুষের নেত্রীতে পরিণত করে। দীর্ঘ ৯ বছরের সেই আন্দোলনে তিনি বারবার গৃহবন্দি হয়েছেন, রাজপথে লাঞ্ছিত হয়েছেন, কিন্তু কখনো মাথা নত করেননি। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে তার ভূমিকা ছিল কিংবদন্তিতুল্য। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ এবং খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির যুগপৎ আন্দোলন স্বৈরাচারের পতন ত্বরান্বিত করেছিল। ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের এক মাইলফলক। সেই নির্বাচনে অভাবনীয় বিজয় অর্জন করে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। এটি ছিল তার রাজনৈতিক জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা, যেখানে তিনি সফলভাবে উত্তীর্ণ হন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গভীর ছাপ রেখে গেছেন। তার শাসনামলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল নারী শিক্ষার প্রসার। ছাত্রীদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা এবং উপবৃত্তি চালু করে তিনি বাংলাদেশে নারী জাগরণের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন, যা আজও প্রশংসিত। তার সরকার ‘সার্ক’ ফোরামকে গতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এছাড়া যমুনা বহুমুখী সেতু বাস্তবায়ন, বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন এবং মুক্তবাজার অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে তার পদক্ষেপগুলো ছিল সুদূরপ্রসারী। ‘একুশ শতকের বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয়ে তিনি তথ্যপ্রযুক্তি এবং কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছিলেন। ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে তাকে পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের নির্জন কারাগারে যেতে হয়। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জন্য সেই পরিবেশ ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। তার স্বাস্থ্যের ক্রমশ অবনতি হতে থাকে। ২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীর প্রাদুর্ভাব ঘটলে মানবিক বিবেচনায় সরকার তার সাজা স্থগিত করে গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’য় থাকার অনুমতি দেয়।

গত কয়েক বছর ধরে তার উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার দাবিটি ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান বিতর্কের বিষয়। লিভার সিরোসিস, হৃদরোগ, কিডনি জটিলতা এবং ফুসফুসে সংক্রমণ নিয়ে তিনি বারবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ২০২৫-এর এই ডিসেম্বরের কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে তিনি লড়াই থামিয়ে দিলেন। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক আন্দোলনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট আমূল বদলে যায়। দীর্ঘদিনের কারারুদ্ধ ও অসুস্থ জীবন পার করা খালেদা জিয়াকে নিয়ে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়। আন্দোলনের পর তার মুক্তি এবং তার আদর্শের প্রাসঙ্গিকতা নতুন প্রজন্মের কাছে এক ভিন্ন মাত্রায় ধরা দেয়। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি দেশের তরুণদের এবং সাধারণ মানুষের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছিলেন, যা তার রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায়ের এক গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দিক। বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি আদর্শ জাতীয়তাবাদী দর্শনের মূর্ত প্রতীক। তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হলো একটি বিশাল জনসমর্থনপুষ্ট দল (বিএনপি) এবং দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তার কঠোর অবস্থান।

খালেদা জিয়ার প্রয়াণ বিএনপির জন্য যেমন এক বিশাল শূন্যতা, তেমনি এটি দলের জন্য এক পরীক্ষার মুহূর্তও বটে। তার রেখে যাওয়া দর্শন এবং আপসহীন মানসিকতা আগামী দিনের রাজনীতিতে তার অনুসারীদের পাথেয় হয়ে থাকবে। একটি নক্ষত্র নিভে গেল সত্য, কিন্তু তার রেখে যাওয়া আলো বা চিহ্নগুলো বাংলাদেশের ধূসর রাজনৈতিক প্রান্তরে দীর্ঘকাল রয়ে যাবে। বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আদর্শ ও মানুষের ভালোবাসা চিরস্থায়ী। ইতিহাসের পাতায় তিনি অমর হয়ে থাকবেন বাংলাদেশের এক অদম্য নেত্রী হিসেবে, যিনি কখনো হারতে শেখেননি। এই হার না মানা মানসিকতাই , বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের মূল শক্তি। বর্তমানে যারা এই দলকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন তারা যেন খালেদা জিয়ার নীতি এবং আদর্শকে পাথেয় করেন। তাহলেই তার আত্মা শান্তি পাবে।

লেখক : প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ জয়পুরা এসআরএমএস স্কুল অ্যান্ড কলেজ রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত