আধুনিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে মৌলিক এবং বাধ্যতামূলক প্রতিশ্রুতিগুলোর একটি হলো, নতুন শিক্ষাবর্ষ। এটি শুরু হলে, শিশুর হাতে শেখার জন্য প্রয়োজনীয় বই থাকবে। এটি কোনো বিলাসী অঙ্গীকার নয়। এতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি বা বিপ্লবী শিক্ষাদর্শের দরকার পড়ে না। দরকার দক্ষতা, দূরদৃষ্টি এবং দায়িত্ববোধ। অথচ বিগত বছরগুলোর মতো আবারও বাংলাদেশ সেই ন্যূনতম প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হতে যাচ্ছে। নতুন শিক্ষাবর্ষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরছে অসম্পূর্ণ পাঠ্যবই নিয়ে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) তথ্য বলছে, মাধ্যমিক স্তরের প্রায় এক-চতুর্থাংশ পাঠ্যবই এখনো ছাপা হয়নি বা অসম্পূর্ণ। কিছু শ্রেণিতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। অষ্টম শ্রেণির বইয়ের ১০ শতাংশেরও কম প্রস্তুত, আর সপ্তম শ্রেণির প্রায় ৭০ শতাংশ বই ছাপাখানায় আটকে আছে। এটি কোনো আকস্মিক দুর্যোগ নয়। বরং এটি এক ধরনের নিত্যনৈমিত্তিক আচরণে পরিণত হয়েছে। আমলাতান্ত্রিক নিখুঁততায় বছরের পর বছর একই ব্যাখ্যা ঘুরেফিরে আসে। দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিলম্ব, ছাপাখানার সংকট, প্রশাসনিক জটিলতা, শেষ মুহূর্তের বাতিল। প্রতিবছর কর্মকর্তারা আশ্বাস দেন, শিগগিরই সমস্যার সমাধান হবে। প্রতিবছর শিক্ষার্থীরা জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত (কখনো তারও বেশি সময়) শেখার মৌলিক উপকরণের জন্য অপেক্ষা করে। প্রতিবছরই এই অব্যবস্থাপনা নিজেকে ঝেড়ে-ধুয়ে আবার শুরু করে, কিন্তু ক্ষত সারিয়ে উঠতে পারে না।
মাধ্যমিক শিক্ষা কেবল প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষার মধ্যবর্তী সেতু নয়; এটি প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানসিক ভিত্তি। এই বয়সেই পাঠাভ্যাস গড়ে ওঠে, কৌতূহল ধার পায়, শৃঙ্খলা শেখা হয়। এই পর্যায়ে অনিশ্চয়তা ও তাৎক্ষণিক জোড়াতালি চাপিয়ে দেওয়া মানে এমন ফলাফলের সঙ্গে জুয়া খেলা, যা পরে কোনো পরীক্ষা সংস্কার দিয়েই ঠিক করা যাবে না। স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষকরা মাঝখানে আটকে পড়েন। কাগজে-কলমে তাদের বলা হয় নতুন কারিকুলাম অনুসরণ করতে, সংশোধিত মূল্যায়ন পদ্ধতি গ্রহণ করতে, হালনাগাদ শিক্ষণ-পদ্ধতি বাস্তবায়ন করতে। বাস্তবে তাদের তা করতে বলা হয় পাঠ্যবই ছাড়া, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া, অনেক ক্ষেত্রে সহায়ক উপকরণ ছাড়াই। এটি সংস্কার নয়, এক ধরনের প্রশাসনিক কল্পকাহিনি। শিক্ষার্থীরাই এর ফল সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভব করে। শহরের কিছু স্কুলে ফটোকপি, গাইডবই বা ডিজিটাল উপকরণে কোনোমতে কাজ চালানো যায়। গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় সে সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে শিক্ষায় বৈষম্য বাড়ে যা কেবল দারিদ্র্যের কারণে নয়, রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার ফলেও। একই পরিবারের দুই ভাইবোন একজন প্রাথমিক স্তরে সময়মতো বই পায়, অন্যজন মাধ্যমিকে পায় না, এই বৈষম্য তখন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। অভিভাবকদের প্রশ্নের মুখে স্কুলের প্রশাসন উত্তর দিতে প্রায়শই ব্যর্থ হয়। পরীক্ষা কীভাবে হবে? সিলেবাস কি কমানো হবে? মূল্যায়নের মানদণ্ড কী হবে? স্পষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব আস্থা ক্ষয় করে। অনিশ্চিত সময়ে শিক্ষা যে স্থিতির উৎস ছিল, সেটিই অনিচ্ছাকৃত পরীক্ষার মাঠে পরিণত হয়। কর্তৃপক্ষের কাছে একে ‘লজিস্টিক সমস্যা’ বলে চালিয়ে দেওয়া কোনো অজুহাত হতে পারে। তবে সেটির প্রয়োগ হবে বড় ভুল। এই কৃত্রিম সংকটটি কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটি দীর্ঘদিনের অবহেলা ও কাঠামোগত অব্যবস্থাপনার ফল। শিক্ষাবর্ষের ক্যালেন্ডার কোনো রহস্য নয়। ১ জানুয়ারির মধ্যে বই বিতরণের সময়সীমা বহু বছর আগেই জানা। যখন নভেম্বরের ছাপার লক্ষ্য বারবার ভেঙে পড়ে, তখন সমস্যা ক্যালেন্ডারে নয়, ব্যবস্থাপনায়।
বিশ্ব জুড়ে পাঠ্যবই বিতরণ খুব গ্ল্যামারাস কাজ নয়, কিন্তু এ কার্যক্রম একটি দক্ষ ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে। কম সম্পদসম্পন্ন দেশও বিকেন্দ্রীভূত ছাপা, ধাপে ধাপে বিতরণ এবং ক্রয়ে ডিজিটাল স্বচ্ছতার মাধ্যমে সময়মতো উপকরণ পৌঁছে দেয়। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও সুপ্রতিষ্ঠিত এনসিটিবি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ প্রতিবছর একই জায়গায় হোঁচট খায়। এই তুলনা অস্বস্তিকর হওয়াই উচিত। এই ব্যর্থতার রাজনৈতিক মূল্যও প্রায়ই খাটো করে দেখা হয়। বাংলাদেশ গর্বের সঙ্গে ১ জানুয়ারি ‘বই উৎসব’ পালন করে ঝকঝকে বইয়ের স্তূপ আর হাসিমুখ শিশুদের ছবি দেখিয়ে। যখন সেই প্রতীক ভেঙে পড়ে, যখন লাখো শিক্ষার্থী খালি হাতে স্কুলে ফেরে তখন পুরো শিক্ষা-বয়ানের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রতীক গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত যখন তা কাঠামোগত ক্ষয় ঢাকতে ব্যবহৃত হয়। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ধারাবাহিকতা শিক্ষার্থীদের কী শেখায়। এটি অকার্যকারিতাকে স্বাভাবিক করে তোলে। শেখায় যে সময়সীমা ঐচ্ছিক, প্রতিশ্রুতি নমনীয়, আর জবাবদিহি দরকষাকষির বিষয়। সেটিই হয়তো সবচেয়ে ক্ষতিকর পাঠ। তাহলে করণীয় কী? প্রথমত, পাঠ্যবই ছাপা ও বিতরণকে রুটিন দাপ্তরিক কাজ নয়, জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে নিতে হবে। এর অর্থ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভেতরে একটি স্থায়ী, উচ্চপর্যায়ের নজরদারি সেল গঠন, যার একমাত্র দায়িত্ব হবে সময়মতো বই পৌঁছানো নিশ্চিত করা। শুধু কার্যাদেশ দিলেই হবে না; ধারাবাহিক তদারকি অপরিহার্য। দ্বিতীয়ত, এনসিটিবির প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত থেকে প্রতিষ্ঠানকে আংশিকভাবে মুক্ত করতে বেশি কার্যকর স্বায়ত্তশাসন, সঙ্গে কঠোর স্বচ্ছতা মানদণ্ড জরুরি। ডিজিটাল ক্রয় প্ল্যাটফর্ম, রিয়েল-টাইম অগ্রগতি ট্র্যাকিং এবং ছাপার সময়সূচি প্রকাশ করলে যে নজরদারি আসবে, তা আজকের ব্যবস্থায় নেই। তৃতীয়ত, বিকল্প পরিকল্পনা মানদণ্ডে পরিণত করতে হবে। বিলম্ব হলে (যা কখনো কখনো হবেই) স্কুলগুলোকে অনুমোদিত অন্তর্র্বর্তী উপকরণ দিতে হবে, ডিজিটাল হোক বা স্থানীয়ভাবে ছাপা।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ মতো জোড়াতালি দিয়ে ছেড়ে দেওয়া কোনো পরিকল্পনা নয়; এটি হবে দায়িত্বহীনতা। জবাবদিহি ছাড়া বারবার বিলম্ব পুনরাবৃত্তি ডেকে আনে। শিক্ষায় প্রশাসনিক অবহেলা নিরীহ ভুল নয়; এটি কোটি মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে। দায়িত্ব একবার স্পষ্ট হলে, প্রয়োগও স্পষ্ট হতে হবে। নতুন শিক্ষাবর্ষ মানে নবীন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকের জন্য নতুন শুরু। যখন সেই শুরু খালি শ্রেণিকক্ষ আর বইহীনভাবে হয়, তখন আশাহত হতে হয়। পাঠ্যবই সংকট কোনো সমাধান-অযোগ্য বিষয় নয়। এই নিষ্ক্রিয়তার মূল্য শুধুমাত্র বিলম্বিত পাঠ বা অনুপস্থিত পাতায় নয়, এর মূল্য পরিমাপ হয় আস্থার হ্রাসে গভীর অসমতায়।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
