বৃষ্টির দেওয়া উপহার

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:৫৬ এএম

বাইরে সব ভাসিয়ে নেওয়ার মতো ঝুম বৃষ্টি পড়ছে। আর আবীর সন্ধ্যাকে বোঝানোর প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। সন্ধ্যার খাঁচা ভেঙে সমুদ্রের প্লাবন বাইরে আসতে চাচ্ছে। সন্ধ্যা বারবার শুধু বলে যাচ্ছে কেন তুমি এমনটা করলে! তোমার মতো একটা মেধাবী ছেলের জীবন নষ্ট হয়ে যাবে! আবীর সন্ধ্যার চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বলছে, নিজের বোনকে এ অবস্থায় দেখে আমি সামলাতে পারিনি নিজেকে। পৃথিবীর কোনো ভাই তা পারে? যদি বিন্দুমাত্রও বিবেক থাকে তাহলে সব ভাই-ই তাই করবে, যা আমি করেছি।

এরপর আবীর স্থির হয়ে পুরো ঘটনা সন্ধ্যাকে বিস্তারিত খুলে বলে। সন্ধ্যা ততক্ষণে কিছুটা শান্ত হয়। যদিও ক্ষণে ক্ষণেই আবারও কেঁদে ওঠে সে। চোখ লাল হয়ে ফুলে গ্যাছে তার। এর ভেতরই আবীর সন্ধ্যাকে বুকের ভেতর জড়িয়ে নিয়েছে। আবীর বলতে শুরু করে আজ থেকে দুই বছর আগে আমি তখন ৩য় বর্ষে পড়ি। পরীক্ষা শেষ করে বাড়ি যাই। বাইরে এমনই বৃষ্টি হচ্ছিল। বেশি রাত না। রাত দশটা হবে। হঠাৎ আমার বোনের ঘর থেকে গোঙানির আওয়াজ পাই। আমি দৌড়ে যাই। গিয়ে ওই দৃশ্য দেখে প্রথমে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যাই। কাউকে কিছু না বলে, রান্নাঘর থেকে বড় ধারালো ছুড়ি নিয়ে এসে,  এলোপাতাড়ি কোপানো শুরু করি। প্রথমে পাষ-টা বুঝতে পারেনি কি হচ্ছে। পিঠে বড় দুইটা কোপ লাগে, বুকেও লাগে। তারপর সে চিৎকার শুরু করে। ততক্ষণে লোকজন জড়ো হয়। আমার বোনটাকে এরপর মারতে শুরু করি। ও মানসিক প্রতিবন্ধী। ও শুধু বলে, হে কইছে আমারে বিয়া করবে।  ঢাকায় ঘুরতে লইয়া যাইবে। সুন্দর সুন্দর শাড়ি কিইন্না দেবে। তখন আমার বোনটার জন্য আমার খুউব মায়া হয়। এর এক সপ্তাহের মাথায় চেয়ারম্যানের লম্পট ছেলেটা মারা যায়। ওরা আমার নামে এটেম্পড টু মার্ডার কেস করে। আমার উকিল বেশ গুছিয়ে এনেছিল। আমার বোনের মুখ থেকে ওদের পক্ষের উকিল কৌশলে কথা বের করে নিয়েছে। যদিও উকিল বলেছে ১০ বছরের বেশি সাজা হবে না। কারণ আমি তো স্বীকার করিনি। কিন্তু যাবজ্জীবন শাস্তি হওয়ার সম্ভাবনা অনেক।

০২.

সন্ধ্যার চোখে আবার শ্রাবণ ধারা। সন্ধ্যা কাঁদো কাঁদো হয়ে বলছে, এই জন্যই তুমি আমাকে প্রথমে কাছে ঘেঁষতে দাওনি? আবীরের সরল স্বীকারোক্তি, হ্যাঁ, কিন্তু তোমার সহজ সৌন্দর্য আমাকে ডুবিয়ে দিয়েছে। গত এক বছর আমি তোমার সঙ্গে সর্বোচ্চ সময় কাটানোর চেষ্টা করেছি। সন্ধ্যা কাঁদতে কাঁদতে বলছে আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করব। দশ বছর এমন কোনো সময় না। আবীর সন্ধ্যাকে জড়িয়ে ধরে। বৃষ্টি আর সন্ধ্যার চোখের নোনা জলের বন্যা আবীরকে যে কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে যাবে, কে জানে! এরপর মহাকালও থেমেছিল বুঝি এক ঘণ্টা। বাইরে বৃষ্টি আর স্তব্ধ সময় সাক্ষী থেকে গেল বুঝি অনেক কিছুর। সন্ধ্যা একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। বারবার আবীর কপালে, গালে চুমু দিয়ে যাচ্ছে। আর সন্ধ্যা নিঃশব্দে চোখের জল ফেলছে।

আবীর রিকশায় সন্ধ্যাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসে। ওরা সেদিন সন্ধ্যার এক বান্ধবীর বাসায় দেখা করেছে। শুধু ওর বান্ধবী বাসায় ছিল। যেতে যেতে আবীর বলছে, আমার মাস্টার্সটা পাস করা হলো না। সন্ধ্যা কাঁদছে আর বলছে আমি কী করব, আমাকে কিছু বল। আবীর স্পষ্ট ও সন্দেহাতীতভাবে বলল পরিবার যা বলবে তাই। সন্ধ্যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংলিশে চতুর্থ বর্ষ পড়ছে।

০৩

আবীরের সঙ্গে সময় কাটানোর ঠিক এক মাসের মাথায় আসিফের সঙ্গে বিয়ে হয় সন্ধ্যার। আসিফ ম্যাজিস্ট্রেট। সন্ধ্যার পরিশীলিত সাবলীল চলাফেরা আসিফকে মুগ্ধ করে রাখে। সন্ধ্যার ব্যাপারে তার কোনো আফসোস নেই। বরং আধুনিক, উদার, জীবনযাপন, পরিশীলিত ব্যবহার আসিফকে অনেক নির্ভরতা দেয় এবং নির্ভার করে রাখে। বেশ চলছে ছিমছাম দাম্পত্য। কেবল সন্ধ্যার মনের তলদেশের নদীতে কখনো কখনো তীব্র জোয়ারের সঙ্গে আসে তোলপাড় করা ঢেউ। তার খবর এই ডিজিটাল প্রযুক্তির কারোরই বোঝা সম্ভব না।

গহিন অন্ধকারে প্রযুক্তি পৌঁছায় না

বিয়ের পরে এক দিন জেলে গিয়ে সন্ধ্যা আবীরের সঙ্গে দেখা করে আসে। আর বলে আবীরের জন্য একটা উপহার আছে। কারাগার  থেকে বের হলে দেবে। আবীর মৃদু হেসে সম্মতি দেয় এবং সন্ধ্যাকে বলে, সে যেন খুব ভালো করে সংসার করে। দাম্পত্য জীবনে সন্ধ্যা সুখী এবং সফল হলে আবীর খুব খুশি হবে।

০৪.

এমএ শেষ করে সন্ধ্যা ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে যোগদান করে। সন্ধ্যার এক মেয়ে, এক ছেলে। মনোযোগ দিয়েই সংসার করে সে। সঙ্গে এম.ফিল করছে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে।

বহুদিন পর আসে সেই আকাক্সিক্ষত দিন। সেদিন শ্রাবণ মাসের সকাল। আকাশ বেশ গম্ভীর। সন্ধ্যাও ততদিনে একটু ভারী হয়ে উঠেছে। হালকা মেদ জমেছে তলপেটে। নারিত্ব তখন মাতৃত্বের রূপে যেন আরও পূর্ণতা পেয়েছে। সন্ধ্যা বর্ষাকে নিয়ে হাজির হয় ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের সামনে। আবীর সেদিন মুক্তি পায়। সন্ধ্যাকে দেখে আবীরের মুগ্ধতা আর যায় না। একটু ভারী, চোখে রিমলেস সোনালি ফ্রেমের চশমা তাকে আরও পরিণত সুন্দর করে তুলেছে। বর্ষাকে দেখিয়ে সন্ধ্যা বলে, আমার মেয়ে। দেখো তো ওর চোখ, ঠোঁট, কান কার মতো? আবীর সন্ধ্যার চোখের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়। সন্ধ্যা এক বেদনার্ত হাসি হেসে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ায়। তিনজন একটা রেস্টুরেন্টে বসে। সন্ধ্যা বর্ষার পছন্দের খাবার অর্ডার করে। অপার বিস্ময়ে আবীর দেখে সব তারই পছন্দের খাবার।

একটু পর সন্ধ্যা আর বর্ষা চলে যায়। বৃষ্টি নামে, আবীর নিজের মনে বলে ওঠে বৃষ্টির কাছে আমার আজন্মের ঋণ। বৃষ্টি আমাকে নবজন্ম উপহার দিয়েছে। আমি গ্রামে যাব প্রচুর গাছ লাগাব, বর্ষাকে আমি এক সবুজ অক্সিজেনপূর্ণ পৃথিবী উপহার দেব।

আবীর বৃষ্টিতে ভেজে আর মহাদেব সাহার সেই কবিতা আওড়াতে থাকে ‘বর্ষা আমার বালক বেলার সই আমি তোর একটা কিছু একটা কিছু হই’।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত