আরেকজন উসমান খাজার পথ সহজ করে দিতে চান খাজা

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৫৮ এএম

বয়স যখন মাত্র চার, তখন বাবা-মায়ের সঙ্গে অভিবাসী হিসেবে ইসলামাবাদ থেকে সিডনিতে এসেছিলেন উসমান খাজা। থাকতেন কুক রোডে, যেখান থেকে রাস্তা পার হলেই সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড। ছোটবেলায় বহুবার স্টেডিয়ামের বন্ধ দরজার সামনে অপেক্ষা করেছেন খাজা, কারণ দিনের খেলার একটা সময় পর দরজা খুলে দিত কর্র্তৃপক্ষ আর তখন বিনা টিকিটে খেলা দেখা যেত। রবিবার সকালে সেই সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডেই নিজের ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটা খেলতে নামবেন খাজা। অস্ট্রেলিয়ার ৪১৯তম টেস্ট ক্রিকেটার এবং প্রথম মুসলিম ক্রিকেটার হিসেবে ২০১১ সালের ৩ জানুয়ারি অভিষেক হয়েছিল তার। ১৫ বছরের ক্যারিয়ারে ৭ বার বাদ পড়েও ফিরে এসেছেন, খেলা হয়েছে ৮৭টা টেস্ট, আর একটা খেলেই ব্যাগি গ্রিনটা তুলে রাখবেন এই বামহাতি ব্যাটসম্যান।

৬২০৬ রান, ১৬টা সেঞ্চুরি। অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ ১০ টেস্ট ব্যাটসম্যানের কাতারেও আসবেন না খাজা। কোনো হল অব ফেমেও হয়তো জায়গা করে নেবেন না। তবে খাজা ক্রিকেটভক্তদের মনে থেকে যাবেন তার হাল না ছাড়ার মানসিকতার জন্য। ৮ বছরে ৭ বার দল থেকে বাদ পড়েন খাজা, প্রতিবারই ফিরে আসেন নতুন করে। নির্বাচকদের বাধ্য করেছেন তাকে আরেকটা সুযোগ দিতে। ক্যারিয়ারের শুরুতে খাজা ব্যাট করতেন তিনে, ক্যারিয়ারের প্রথম ৭৭টা ইনিংসের ৬৬টিতেই খাজা তিনে ব্যাট করেছেন। বাদ পড়ার পর ৮০ ইনিংসে খাজা ব্যাট করেছেন ১-৬ এর সবকয়টি জায়গায়, কেবলমাত্র তিন নম্বর বাদে! ব্যাপারটাকে খাজা বলছেন, দুটো অর্ধের গল্প, ‘এটা আসলে দুইটা অধ্যায়, আমি অবশ্যই প্রথম অধ্যায়ের চেয়ে দ্বিতীয় অধ্যায়টাই বেশি উপভোগ করেছি’।

উসমান খাজাকে মানুষ আরও বেশি মনে রাখবে তার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরের জন্যও। তার জন্য যাত্রাটা সহজ ছিল না অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটাঙ্গনে। তাকে শুনতে হয়েছে বর্ণবাদী মন্তব্য, শুনতে হয়েছে জাতিগত বৈষম্যমূলক মন্তব্য। শেষ সংবাদ সম্মেলনেও খাজা বলেছেন, ‘যখন আমার পিঠে ব্যথা হলো, আমি দেখলাম সব সাবেক খেলোয়াড় আর গণমাধ্যম আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। সবাই মিলে আমার ওপর বোঝা বাড়াচ্ছিল, এটা ৫ দিন ধরে সহ্য করে গেছি। গোটা জীবন ধরে শুনতে হয়েছে আমি পাকিস্তানি, আমি অলস, আমরা দলের কথা ভাবি না, শুধু নিজের জন্য খেলি এমন অনেক খোঁটা’।  নিজের বিদায়ী বক্তব্যেও খাজা বলেছেন কীভাবে অশ্বেতাঙ্গ হওয়ার কারণে তাকে বারবার কাঠগড়ায় তুলেছে অস্ট্রেলিয়ার গণমাধ্যম, ‘আমি এমন অসংখ্য উদাহরণ দিতে পারব, যেখানে একজন ক্রিকেটার ম্যাচের আগের দিন গলফ খেলেছে এবং চোট পেয়েছে, কিন্তু গণমাধ্যমে কিছু লেখা হয়নি। আমি এমনও দেখেছি যে ম্যাচের আগের দিন ১৫টা বিয়ার খেয়েছে এরপর ম্যাচের দিন চোটগ্রস্ত হিসেবে খেলতে নামেনি। অথচ আমি যখন চোট পেলাম সবাই আমার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলল’। গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর নির্মমতা, হত্যাকা-ের প্রতিবাদে জুতায় প্রতিবাদলিপি লিখে নামতে চেয়েছিলেন মাঠে। পরে সেটা আইসিসি অনুমোদন দেয়নি।

উসমান খাজা তাই শুধু একজন ক্রিকেটারই নন, প্রথাভাঙার একজন অগ্রদূত। খাজা তার বিদায়ী বক্তব্যে বলেছেন, পরের উসমান খাজার জন্য তিনি রাস্তাটা সহজ করে যেতে চান, ‘অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট দলে সুযোগ পাওয়াটা কঠিন। মাত্র ১১জন খেলে, কেউই জাতীয় দলে জায়গাটা উপহার পায় না। এখানে সুযোগ পাওয়া সহজ নয়। আমি আশা করব আমি যেন পরের প্রজন্মের উসমান খাজার জন্য পথটা সহজ করে দিতে পারি, যাতে করে একজন উসমান খাজাকে ও একজন জন স্মিথকে (অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নেওয়া শ্বেতাঙ্গ ক্রিশ্চিয়ান অর্থে) এর সমান চোখে দেখা হয়।’ অ্যাশেজের মাঝপথে অ্যাডিলেডে স্টিভেন স্মিথের হঠাৎ চোটে দলে সুযোগ পান খাজা, করেন ৮২ ও ৪০ রান। এরপর মেলবোর্নে ২৯ ও ০। সিডনিতে শেষ টেস্টে কত করবেন খাজা? তার মোট রান এই পর্যায়ে ৬২০৬, অন্তত২৯ রান করলে মাইক হাসিকে ছাড়িয়ে ডন ব্র্যাডম্যানের ঠিক নিচে আসতে পারবেন। শেষ বেলায় এইটুকু তো করারই কথা তার!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত