বাংলাদেশের কৃষি এক দ্বৈত বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার তাগিদ, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ এবং সীমিত আবাদযোগ্য জমিতে অধিক ফলনের অপরিহার্যতা অন্যদিকে অধিক ফলনের জন্য ক্রমবর্ধমান রাসায়নিক সার ব্যবহার হচ্ছে। এতে কৃষি, পরিবেশ ও জাতীয় অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ বাড়ছে। কৃষিতে রাসায়নিক সার অপরিহার্য, এটি অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয়েছে সেখানে, যেখানে প্রয়োজনের সীমা অতিক্রম করে ‘বেশি দিলে ভালো হবে’ এই ভ্রান্ত ধারণা যা কৃষিব্যবস্থায় প্রোথিত হয়ে গেছে। ফসলের খাদ্য ও মাটির পুষ্টি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি মূলত একটি বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বিষয়টি মৃত্তিকা বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে, স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি উদ্ভিদ তার স্বাভাবিক বৃদ্ধি, বিকাশ এবং কাক্সিক্ষত ফলন অর্জনের জন্য মোটামুটি ১৬ থেকে ১৭টি মৌলিক পুষ্টি উপাদানের ওপর নির্ভরশীল। যেগুলো মাটি থেকে পর্যায়ক্রমে গ্রহণ করে। এই উপাদানগুলোর মধ্যে নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম হলো প্রধান পুষ্টি উপাদান। যাদের চাহিদা তুলনামূলকভাবে বেশি এবং যেগুলো সাধারণত ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের মাধ্যমে জমিতে সরবরাহ করা হয়।
উদ্ভিদের সুস্থ বৃদ্ধি কেবল এই তিনটি উপাদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সালফার, বোরন ও জিঙ্কের মতো বিভিন্ন মাইক্রো পুষ্টি উপাদান, অল্প পরিমাণে প্রয়োজন হলেও উদ্ভিদের শেকড়, ফুল, ফল, বীজ ও সামগ্রিক উৎপাদন প্রক্রিয়ায় এগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তব সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন এই পুষ্টি উপাদানগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারিত সুষম অনুপাতে প্রয়োগ না করে অনুমানের ভিত্তিতে অথবা সামাজিক প্রভাব ও প্রচলিত ধারণার ওপর নির্ভর করে ব্যবহার করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ইউরিয়াকে সব ধরনের উৎপাদন সমস্যার সহজ সমাধান মনে করে অতিরিক্ত পরিমাণে প্রয়োগ করা হয়। অথচ একই সময়ে মাটিতে ফসফরাস বা পটাশিয়ামের ঘাটতি রয়ে যায়। এর ফলে মাটির ভেতরের পুষ্টির স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়, উদ্ভিদ প্রয়োজনীয় সব উপাদান একসঙ্গে পায় না এবং কাক্সিক্ষত ফলন অর্জন সম্ভব হয় না। দীর্ঘমেয়াদে এই অসম ও অবিবেচিত সার ব্যবহারে মাটির উর্বরতা হ্রাস পায়, উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং কৃষক প্রত্যাশিত লাভ থেকে বঞ্চিত হন যা কৃষিব্যবস্থায় একটি গভীর ও নীরব সংকট তৈরি করে। অতিরিক্ত সারের কুফল কেবল মাটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি ধীরে ধীরে পরিবেশ ও জনজীবনের ওপর বিস্তৃত প্রভাব ফেলে। যে কারণে এর ক্ষতি বহুমাত্রিক রূপ ধারণ করে। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে মাটির অম্লতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়, যা বর্তমানে কৃষিতে একটি বাস্তব সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, দেশের প্রায় ৪৬ শতাংশ আবাদি জমি এখন অধিক বা অত্যধিক অম্লীয় অবস্থায় রয়েছে। অম্লীয় মাটিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান উদ্ভিদের জন্য সহজলভ্য থাকে না, ফলে গাছ প্রয়োজনীয় খাদ্য গ্রহণে ব্যর্থ হয়। এই পরিস্থিতিতে কৃষকরা সমস্যার প্রকৃত কারণ অনুধাবন না করে আরও বেশি সার প্রয়োগ করেন, যা শেষ পর্যন্ত ফলন বাড়ানোর বদলে অপচয় ও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অতিরিক্ত রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে মাটিতে জৈব পদার্থের মারাত্মক ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে, যা মাটির স্বাভাবিক স্বাস্থ্য ও উৎপাদন ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
বর্তমানে দেশের প্রায় ৭২ শতাংশ আবাদি জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ মাত্র শূন্য দশমিক পাঁচ থেকে দুই শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যেখানে আদর্শভাবে এই হার পাঁচ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন। জৈব পদার্থ কমে গেলে মাটির অনুজৈবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়, ফলে সারের পুষ্টি উপাদানগুলো আয়নিক রূপে রূপান্তরিত হতে পারে না এবং উদ্ভিদ তা কার্যকরভাবে গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়। এর ফলে মাটির উর্বরতা ক্রমশ হ্রাস পায় এবং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে থাকে। অতিরিক্ত সার ব্যবহারের পরিবেশগত প্রভাবও অত্যন্ত উদ্বেগজনক, যা অনেক সময় চোখে না পড়লেও এর ক্ষতি গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। অতিরিক্ত নাইট্রোজেন মাটিতে ধরে না থেকে লিচিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশে যায়, পানিদূষণ ঘটায় এবং জলাশয়ে ইউট্রোফিকেশন সৃষ্টি করে। এর ফলে জলজ পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং ধীরে ধীরে এই দূষণ মানুষের পানির উৎসে পৌঁছে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। এভাবে অতিরিক্ত সারের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মাটি থেকে শুরু করে পরিবেশ ও মানবজীবন পর্যন্ত একটি নীরব কিন্তু গভীর সংকটের জন্ম দিচ্ছে। রাসায়নিক সারের অপব্যবহার কেবল মাটির উর্বরতা বা কৃষি উৎপাদনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সরাসরি জাতীয় অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। কৃষকদের সহায়তা করা এবং খাদ্যপণ্যের বাজারমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে সরকার প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি দিয়ে আসছে। কৃষকের বাস্তবতা ও সচেতনতার ঘাটতি বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, কৃষক কেন অতিরিক্ত সার ব্যবহার করেন? এর কোনো একক বা সরল উত্তর নেই। বরং তার পেছনে রয়েছে বাস্তবতার নানা স্তর ও পরস্পরসংযুক্ত কারণ। প্রথমত, দেশের বহু কৃষিজমিতে দীর্ঘদিনের রাসায়নিক সারের নির্ভরতার ফলে মাটির অম্লতা বেড়েছে এবং জৈব পদার্থের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার কারণে প্রয়োগ করা সার অনেক সময় প্রত্যাশিত কার্যকারিতা দেখাতে পারে না। এর ফলে কৃষকের মনে ধারণা তৈরি হয় যে সার যথেষ্ট হয়নি, তাই তিনি আগের চেয়ে আরও বেশি সার ব্যবহার করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। দ্বিতীয়ত, মাঠপর্যায়ে কৃষকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সার ব্যবসায়ীদের পরামর্শ, পাশের জমিতে চাষ করা প্রতিবেশীর অভিজ্ঞতা এবং দ্রুত ফলন বাড়ানোর তাড়না গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক ক্ষেত্রে এসব অনানুষ্ঠানিক পরামর্শ বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর দাঁড়ায় না, তবু ফলনের আশায় কৃষক তা অনুসরণ করেন এবং ধীরে ধীরে মাত্রাতিরিক্ত সার ব্যবহারের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে একটি মৌলিক বাস্তবতা, যা হলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মাটি পরীক্ষা না করেই সার প্রয়োগ করা হয়। ফলে জমির প্রকৃত পুষ্টি চাহিদা সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় সার ব্যবহারে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয় এবং অপচয় বাড়তে থাকে, যার ক্ষতি শেষ পর্যন্ত কৃষক নিজেই সবচেয়ে বেশি অনুভব করেন। উত্তরণের পথ হিসেবে, সুষম পুষ্টি ও টেকসই কৃষির ধারণাকে সামনে রেখে এখনই সমন্বিত ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি হয়ে উঠেছে। কারণ বর্তমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে খণ্ডিত উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রথমত, মাটি পরীক্ষা ভিত্তিক সার ব্যবস্থাপনাকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং ধাপে ধাপে এটিকে বাধ্যতামূলক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে, যাতে জমির প্রকৃত পুষ্টি চাহিদা নির্ণয় করে সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগ করা সম্ভব হয়। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন সারের অপচয় কমবে, অন্যদিকে তেমনি মাটির দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য রক্ষার ভিত্তি তৈরি হবে। দ্বিতীয়ত, দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় অম্লীয় মাটির সমস্যা মোকাবিলায় ডলোমাইট বা চুন প্রয়োগের মাধ্যমে মাটির পিএইচ উন্নত করার উদ্যোগ জোরদার করতে হবে, যাতে মাটিতে বিদ্যমান পুষ্টি উপাদান উদ্ভিদের জন্য সহজলভ্য হয় এবং একই পরিমাণ সারে অধিক কার্যকারিতা পাওয়া যায়। তৃতীয়ত, রাসায়নিক সারের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে জৈব সার, ভার্মি কম্পোস্ট ও সবুজ সার ব্যবহারে ব্যাপক উৎসাহ প্রদান করা প্রয়োজন, কারণ এসব উপাদান মাটির জৈব পদার্থ বৃদ্ধি করে এবং মাটির জীবনীশক্তি পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাস্তবতা হলো, দেশে প্রয়োজন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ মেট্রিক টন জৈব সার। এর বিপরীতে বর্তমান উৎপাদন মাত্র ৩৩ লাখ মেট্রিক টন, তবু উদ্যোক্তা বৃদ্ধি, স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন উদ্যোগ এবং প্রকল্পভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এই ঘাটতি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা সম্ভব। তবে এসব পদক্ষেপের সফলতার মূল চাবিকাঠি হলো কৃষকের সচেতনতা বৃদ্ধি, কারণ সচেতন কৃষকই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম, গণমাধ্যমের ভূমিকা এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বেশি নয়, সঠিক সার এই বার্তাকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেই সুষম পুষ্টি ব্যবস্থাপনা ও টেকসই কৃষির পথে বাস্তব অগ্রগতি সম্ভব হবে। আমাদের কৃষি আজ রাসায়নিক সারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই বাস্তবতা অস্বীকারের কোনো সুযোগ নেই। কারণ বর্তমান খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থা অনেকটাই এই উপকরণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। তবে নির্ভরতা যদি সুষম ও বিজ্ঞানভিত্তিক না হয়, তাহলে তা ধীরে ধীরে আশীর্বাদ থেকে অভিশাপে পরিণত হওয়া স্বাভাবিক। মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা নষ্ট হওয়া, পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ এই অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফল। মাটির স্বাস্থ্যরক্ষা, পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখা এবং জাতীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতার স্বার্থে রাসায়নিক সারের অপচয় রোধ এখন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়, বরং এটি সময়ের একটি জরুরি দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথমত, সুষম পুষ্টি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফসলের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী সঠিক ধরনের ও সঠিক মাত্রার সার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে উৎপাদন বাড়লেও মাটির ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিনের রাসায়নিক নির্ভরতার ফলে যে জৈব পদার্থের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা পূরণে জৈব পদার্থের পুনর্জাগরণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, কারণ জীবন্ত মাটি ছাড়া টেকসই কৃষি কল্পনাই করা যায় না। তৃতীয়ত, এসব উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে সচেতন কৃষক, যিনি বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবেন। এই তিনটি বিষয়ের সমন্বিত বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই বাংলার কৃষি একটি টেকসই, লাভজনক ও ভবিষ্যৎমুখী রূপ লাভ করতে পারে। এটি শুধু বর্তমান প্রজন্ম নয়, আগামী দিনের খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তিও সুদৃঢ় করবে।
লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, চেয়ারম্যান ডিআরপি ফাউন্ডেশন