‘যুক্তরাষ্ট্র যা চায় তাই অর্জন করতে সক্ষম’ এমন ধারণা এবার আরও পোক্ত হলো! দেশটির সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ ইউনিট মাত্র কয়েক ঘণ্টার অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে কারাকাস থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর সে ধারণা অনেকের মধ্যেই আরও পোক্ত হয়েছে। ইরাক এবং আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ডের কারণে দেশটি আরও আগেই বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র হয়ে উঠেছে। দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও যেন সেটা প্রমাণ করতে উঠে-পড়ে লেগেছেন। ভেনেজুয়েলায় হস্তক্ষেপের পর এবার তিনি কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে সরানোরও হুমকি দিয়েয়েছে। মেক্সিকোকে সতর্ক করে বলেছেন, মাদকপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে তাদের হস্তক্ষেপ করতে হবে। আর ইরানকে রেখেছেন হুমকির ওপরেই। সব শেষ গত রবিবার ট্রাম্প বলেছেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড দরকার এবং ডেনমার্ক এটি আটকাতে পারবে না।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন কর্মকা- ও ঘোষণার পর বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের নেতৃত্বে বিশ্ব ভূ-রাজনীতি এক নতুন অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক যুগে প্রবেশ করছে। ওয়াশিংটন পোস্টের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই পরিস্থিতিকে ‘ভূ-রাজনৈতিক ওয়াইল্ড ওয়েস্ট’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে শক্তিই নিয়ম নির্ধারণ করবে এবং আন্তর্জাতিক আইন-কানুন ও নিয়মাবলি দুর্বল হয়ে পড়বে।
গত শনিবার রাতে মার্কিন বিশেষ বাহিনী এক অভূতপূর্ব অভিযান চালিয়ে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে মার্কিন ভূখণ্ডে নিয়ে আসে। এর আগে মার্কিন বাহিনী ভেনিজুয়েলার বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই অভিযানের পর ঘোষণা করেন, পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন আধিপত্য আর কখনো প্রশ্নবিদ্ধ হবে না।
ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই অভিযান ট্রাম্পের বিদেশ নীতির অস্থিরতা, সামরিক সমাধানের প্রতি তার পছন্দ এবং প্রভাব বলয়ের ভিত্তিতে বিশ্ব শাসনের প্রতি তার ‘খায়েস’ প্রকাশ করে। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য আরেকটি আঘাত।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ বিশ্বকে এমন এক যুগে নিয়ে যাচ্ছে যেখানে শক্তিশালী দেশগুলো নিয়ম ভেঙে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করবে। এটি অন্যান্য শক্তিশালী দেশগুলোকে অনুরূপ অ্যাডভেঞ্চারিজমের সুযোগ করে দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন বিদেশ নীতি আরও অপ্রত্যাশিত হয়ে উঠছে। ভেনিজুয়েলা অভিযানের মাধ্যমে তিনি পশ্চিম গোলার্ধে মনরো ডকট্রিনের এক আধুনিক সংস্করণ প্রয়োগ করছেন, যাকে কেউ কেউ ‘ডনরো ডকট্রিন’ বলে অভিহিত করছেন। এর ফলে বিশ্বশৃঙ্খলা আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পরিবর্তে প্রতিযোগিতা ও সংঘাত বাড়তে পারে।
এদিকে বিবিসি বলছে, দ্বিতীয় মেয়াদে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় আসার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন এক আশঙ্কা জন্ম নেয় বিশ্ববাসীর মনে। কারণ, প্রথম মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার দুই বছর পর ট্রাম্প ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড কেনার আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন।
সে সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, গ্রিনল্যান্ড কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তবে সে সময় ভূখণ্ডটির বৈধ মালিক ডেনমার্ক জোর দিয়ে বলেছিল, ‘তাদের ভূমি বিক্রির জন্য উন্মুক্ত নয়।’
দ্বিতীয়বার হোয়াইট হাউজে প্রবেশের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড ইস্যুকে আবার সামনে নিয়ে আসেন। গত বছরের ২২ ডিসেম্বর ফ্লোরিডার মার-আ-লাগোতে সাংবাদিকদের সামনে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা স্বার্থে গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ড আমাদের দরকারই’, ‘গ্রিনল্যান্ড আমাদের দরকারই’। পরদিন আলজাজিরার একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘ওটা আমাদের দরকারই’ : ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড ইস্যু নতুন করে জাগিয়ে তুললেন, ডেনমার্কে প্রতিবাদ। সেই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, ট্রাম্প বলেছেন, ‘খনিজের জন্য নয়, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন।’
তিনি আরও বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ডের উপকূলে রাশিয়া ও চীনের জাহাজগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাই ওটা আমাদের চাইই।’
আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় জানা যায়, প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের খনিজসম্পদের ওপর জোর দিলেও দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি জাতীয় নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। গত বছর জানুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণের পর ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, তিনি বিশ্বাস করেন যুক্তরাষ্ট্র ডেনমার্কের এই দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হবে। একই বছরের ২০ জানুয়ারি শপথগ্রহণের মাত্র পাঁচ দিন পর এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘মনে হয় আমরা ওটা পেয়ে যাব।’ বছর পেরোতে না পেরোতেই, গত ২২ ডিসেম্বর ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের গভর্নর জেফ ল্যান্ড্রিকে তিনি গ্রিনল্যান্ডের বিশেষ দূত নিয়োগ করেছেন। এই নিয়োগ পেয়ে ল্যান্ড্রি এক্স-এ লেখেন, ‘এটা বিরাট সম্মানের।’ তিনি জানান, গভর্নরের দায়িত্বের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন। ভিডিওবার্তায় তিনি নিজের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন এবং বলেন, ‘ওটাকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করবই।’
এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ন্যাটো মিত্র ডেনমার্ক। তারা আশা করে যে, এমন সংকটে ইউরোপ তাদের পাশে দাঁড়াবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প যা বলেন তা সাধারণত বাস্তবে রূপ দেন। তিনি গ্রিনল্যান্ড দখলের কথা বলছেন এবং যেকোনো উপায়ে তা অর্জনের হুমকি দিচ্ছেন। তাদের মতে, ন্যাটোর সদস্য হিসেবে ডেনমার্ক এবং যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা প্রদান করে। গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার কথা বলছে তা দখল ছাড়াই নিশ্চিত করা সম্ভবযেমন ঘাঁটির সংখ্যা বা সক্ষমতা বাড়িয়ে আর্টিক অঞ্চলে নজরদারি বৃদ্ধি করা।
তারা বলছেন, সেটা না করে একটি শক্তিশালী দেশ যখন সামরিকভাবে দুর্বল দেশের ভূমি দখলের হুমকি দেয়, তখন তা আতঙ্কের কারণ হয়ে ওঠে। এটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি এবং দীর্ঘদিনের মিত্র ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্থায়ী মহাদেশীয় সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।
ইউরোপীয় নেতাদের মতে, আন্তর্জাতিক আইন দেশগুলোর সীমানাকে বৈধতা দিয়েছে। কেউ ইচ্ছামতো অন্য দেশের ভূমি নিজের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে না। গ্রিনল্যান্ড কোনো দেশের অংশ হবে তা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগেই নির্ধারিত হয়ে গেছে। এখন নতুন করে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই। তাই গ্রিনল্যান্ড দখল কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তবে ট্রাম্পও নাছোড়বান্দা হয়ে তার পরের অভিযান বরফে ঢাকা দ্বীপে চালাবেন কি না সেদিকে তাকিয় থাকবে বিশ্ব।
আসলে ঐতিহাসিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্র ভূমি কিনে বা দখল করে নিজেকে বিস্তার করেছে। সর্বশেষ ১৮৬৭ সালে রাশিয়ার কাছ থেকে আলাস্কা কেনে যুক্তরাষ্ট্র। এবার যুক্তরাষ্ট্র ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ করতে চায়। বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ হিসেবে পরিচিত গ্রিনল্যান্ডের আয়তন প্রায় ২১ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬ বর্গকিলোমিটার, যা যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম অঙ্গরাজ্য টেক্সাসের তিন গুণেরও বেশি। আয়তনের হিসাবে গ্রিনল্যান্ড বাংলাদেশের প্রায় ১৫ গুণ বড়। গত বছর দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের মতে গ্রিনল্যান্ডের মূল্য ১২.৫ বিলিয়ন থেকে ৭৭ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে হতে পারে। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, ১৯১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র ডেনমার্কের কাছ থেকে ২৫ মিলিয়ন ডলারে (বর্তমান মূল্যে ৬৫৭ মিলিয়ন) ভার্জিন আইল্যান্ডস কিনেছিল। ক্যারিবীয় অঞ্চলের এই ১ হাজার ৯১০ বর্গকিলোমিটারের দ্বীপগুলো জাতীয় প্রতিরক্ষার যুক্তিতে কেনা হয়।
প্রতিবেদন অনুসারে, প্রতিরক্ষার জন্য কেনা ভূমির মূল্য আয়তনের ওপর নির্ভর করে না, বরং ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল।
