সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় ধরনের নৈরাজ্য হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলা নৈরাজ্য বন্ধে সরকার, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে পর্যাপ্ত সচেতনতা বা কার্যকর উদ্যোগ নেই বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
‘গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য মুক্ত আলোচনা : ডিজিটাল অর্থনীতি ও উদ্যোক্তা প্রসঙ্গ’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন দেবপ্রিয়। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)। সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও আলোচক ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আবদুল মজিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম জাহিদ, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের স্কুল অব বিজনেসের ডিন এম এ বাকী খলীলী প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে ডিজিটাল অর্থনীতি দ্রুত বিকাশমান হলেও এই খাতে এখনো নীতিগত অস্পষ্টতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, উচ্চ ব্যান্ডউইথ ব্যয়, ডিজিটাল বৈষম্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে জবাবদিহির অভাবসহ নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নৈরাজ্য বিষয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘নারীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ভুয়া তথ্য এসব নিয়ন্ত্রণে সরকার বা নির্বাচন কমিশনের কার্যকর ভূমিকা অনুপস্থিত। কিছু ক্ষেত্রে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যে ছোটখাটো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো ফলপ্রসূ করার ক্ষেত্রেও নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিক থেকে কোনো উদ্যোগ এখন পর্যন্ত দেখছি না।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নৈরাজ্যমূলক কাজ বন্ধে গত বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে সরকারের পক্ষ থেকে মেটাকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি একটি সঠিক পদক্ষেপ। তবে মেটার বাংলাদেশে অফিস নেই, ভাষাগত সীমাবদ্ধতাও আছে। তবু রাজনৈতিক সহিংসতা, বিদ্বেষ ও ঘৃণা নিয়ন্ত্রণে এ বিষয়ে আরও জোরদার পদক্ষেপ প্রয়োজন।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইতিবাচকভাবে ব্যবহারেরও সুযোগ ছিল বলে মনে করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘ভোটার তালিকা, ভোটকেন্দ্র, অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি, ভোট গণনার স্বচ্ছতা এসব বিষয়ে পরিষ্কার তথ্য দেওয়ার সুযোগ ছিল। সেটিও করা হচ্ছে না। উদ্বেগের জায়গা এতটাই গভীর যে, নাগরিকরা দায়িত্বশীল নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন। একই সঙ্গে তারা এটাও মনে করেন, গণতন্ত্র ছাড়া নিয়ন্ত্রণ বিপজ্জনক হতে পারে। নেপালের অভিজ্ঞতা আমাদের তা মনে করিয়ে দেয়।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ায় ১২ বছরের কম বয়সীদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ডেনমার্কে করতে চাচ্ছে। আমরা নাগরিকদের জিজ্ঞেস করেছি, আপনারা কি এটির পক্ষে, ওনারা “হ্যাঁ” বলেছেন। অর্থাৎ এক ধরনের দায়িত্বশীল নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে তারা প্রয়োজন মনে করছেন। তখন আমি তাদের মনে করিয়ে দিয়েছি, এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়েই কিন্তু নেপালে সরকার পড়ে গেছে। সেটাও মনে রাখতে হবে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশৃঙ্খলা, ডিজিটাল সুরক্ষা আইনের বিষয়ে নাগরিকদের উদ্বেগগুলো আরও জোরদারভাবে সরকারের কাছে যেমন নিতে হবে, আগামী দিনে যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চান, তাদের কাছেও এই দাবিটা জোরদারভাবে নিতে হবে। যদি এটি নিয়ে ওনারা কার্যকরভাবে কাজ না করেন, তাহলে ২০২৪ সালের আগস্টের মতো আবার দেশ ছেড়ে পালানোর মতো ঘটনা ঘটতে পারে।’
সিজিএস প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান বলেন, ‘দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি, সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা, রাজনীতি, গণতন্ত্র কোনোটার জন্যই কল্যাণকর নয়। মেরূকরণ ও বিভাজনের যে রাজনীতি আমরা এখন প্যাট্রোনাইজ (সমর্থন) করছি। আমি বলব যে রাষ্ট্র আসলে এটাকে প্যাট্রোনাইজ করছে। সেখান থেকে আমরা কীভাবে বের হব, সেটা নিয়ে আমার মধ্যে যথেষ্ট সংশয় আছে।’
