সিরাজগঞ্জে দীগন্ত জোড়া ফসলের মাঠ সরিষার হলুদ ফুলে ছেয়ে গেছে। বাংলা পৌষ মাসের কনকনে ঠাণ্ডা ও হিমেল হাওয়ায় সরিষার ফুল দোল খাচ্ছে। দিগন্তজোড়া হলুদ গালিচায় চলছে মৌমাছির মধু সংগ্রহ।
মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে জেলার ৯ উপজেলায় সরিষা ক্ষেতের পাশে পাঁচ শতাধিক চাষি তাদের খামারের মৌ বাক্স স্থাপন করেছে। এ মধু সংগ্রহের সময় মৌমাছির পরাগায়নের ফলে সরিষার ফলন বাড়বে বলে আশা করেছেন কৃষি বিভাগ।
বুধবার (৭ জানুয়ারী) জেলা কৃষি বিভাগ সুত্র জানায়, চলতি মৌসুমে ১ লাখ ৪৬ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হচ্ছে। এখান থেকে মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০৪ টন। সরিষা ও মধুতে মৌসুমে ১১শ কোটি টাকার বাণিজ্যের আশা কৃষি বিভাগের।
এদিকে মধু উৎপাদন অব্যাহত রাখতে ও মৌমাছি বাঁচাতে সরিষা ফুলে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার বন্ধে কৃষকদের সচেতনতার দাবি জানিয়েছেন মৌচাষিরা।
যশোর থেকে আসা মৌ চাষি আমিরুল ইসলাম জানান, উল্লাপাড়ায় ৩০০টি মৌ বাক্স বসানো হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে একাই ৪ হাজার ৫০০ কেজির বেশি মধু সংগ্রহ করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি। একই কথা জানান সাতক্ষীরার মৌ চাষি পলাশ ও স্থানীয় খামারি রাকিব হোসেন। রাকিব বলেন, গত কয়েক বছর ধরেই এখানে মধু সংগ্রহ করছি, প্রতিবারই ভালো লাভ হয়েছে।
উত্তরবঙ্গ মৌচাষী সমিতির সভাপতি আব্দুর রশিদ বলেন, অনেক মৌচাষিদের কৃষি পণোদনা হিসেবে মৌ-বাক্স দেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে পরামর্শ এবং মৌ খামারিদের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা সব মিলিয়ে কৃষি বিভাগ সরাসরি উৎপাদন বৃদ্ধিতে কাজ করছে। বর্তমানে ১০ হাজার কেজি মধু সংগ্রহ করেছে মৌচাষিরা। আবহাওয়া অনুকুলে থাকলে লক্ষ্যমাত্রা পুরণ হবে বলে তিনি আশা করছেন।
উল্লাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুবর্না ইয়াসমিন সুমী বলেন, এ উপজেলায় চলতি মৌসুমে ২৪ হাজার ৬০৫ হেক্টর জমিতে সরিষার চাষ হয়েছে। এখানকার আবহাওয়া ও সরিষার ফুল মধু উৎপাদনের জন্য খুবই উপযোগী। এ সরিষার ফুল থেকে মধু সংগ্রহে স্থানীয় মৌচাষি ছাড়াও অন্যত্র থেকে অনেকেই এসেছেন। মধু উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষকের আয় বাড়ছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে।
চলনবিল অধ্যুষিত তাড়াশ উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সেন গুপ্তা জানান, এ উপজেলায় ১০ হাজার ৪৭০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। হলুদ ফুলে ছেয়ে গেছে পুরো মাঠ। প্রায় ৫ হাজার মৌবক্স মধু সংগ্রহের জন্য বসানো হয়েছে। আরও বক্স বসানোর প্রস্তুতি চলছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শষ্য) মোহাম্মদ রেজাউল হক বলেন, মৌমাছি মধু সংগ্রহের সময় ফুলে ফুলে উড়ে পরাগায়ন ঘটায়। এতে শষ্যের উৎপাদন ১৫ শতাংশ বাড়ে। ফলে মধু চাষি ও কৃষক উভয় লাভবান হয়। উৎপাদিত মধু মাঠ থেকে দেশের বড় বড় কোম্পানি কিনে বাজারজাত করে। প্রতি কেজি মধু ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (উপ-পরিচালক) এ. কে. এম মনজুরে মওলা বলেন, সরিষা ও মধুকে ঘিরে জেলায় বড় পরিসরে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতে কৃষি বিভাগ মাঠপর্যায়ে সমন্বিতভাবে কাজ করছে। সরিষা চাষিদের জন্য উন্নত ও উচ্চফলনশীল জাতের বীজ বিতরণ, সার ও সুষম সার ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পরামর্শ, সময়মতো বপন ও সঠিক পরিচর্যার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, মৌ চাষিদের ক্ষেত্রেও আমরা নিয়মিত প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছি। মৌ বাক্স স্থাপনের সঠিক দূরত্ব, প্রতি একর জমিতে কতটি মৌ বাক্স বসানো উপযুক্ত, এ বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কীটনাশক ব্যবহারে সতর্কতা, যাতে মৌমাছির ক্ষতি না হয়, সে বিষয়েও কৃষকদের সচেতন করা হচ্ছে।
