মাঝারি শৈত্যপ্রবাহের কারণে রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এতে এখানকার হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ সৃষ্টি হয়েছে, যা চিকিৎসাসেবা প্রদানে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কিওলাইটিস, সর্দি-কাশি, জ্বর এবং মৌসুমি ডায়রিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ঘন কুয়াশা, হিমেল বাতাস এবং নিম্ন তাপমাত্রার কারণে এই রোগগুলোর প্রকোপ বেড়েছে, যা দুর্বল ইমিউন সিস্টেমের মানুষদের বেশি প্রভাবিত করছে।
গত কয়েক দিন ধরেই শীতের তীব্রতা অব্যাহত রয়েছে উত্তরাঞ্চলে। চলছে শৈত্যপ্রবাহ, যার মধ্যে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মাঝারি থেকে তীব্র শৈত্যপ্রবাহের প্রভাব লক্ষ করা গেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে গত মঙ্গলবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ওই দিন দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল। পরদিন অর্থাৎ গতকাল বুধবার তাপমাত্রা সামান্য বেড়ে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়েছে, তবে নওগাঁর বদলগাছীতে দেশের সর্বনিম্ন ৬.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড হয়েছে। এছাড়া, ঘন কুয়াশার কারণে সারা দিন সূর্যের দেখা মিলছে না বা মিললেও রোদের প্রখরতা কম থাকায় দিনের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্য খুবই কম। হিমেল বাতাসের কারণে শীতের অনুভূতি আরও তীব্র হয়ে উঠছে, যা প্রাণিকুলসহ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
রাজশাহী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের সিনিয়র পর্যবেক্ষক রাহিদুল ইসলাম জানান, ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ, ৬ থেকে ৮ ডিগ্রিকে মাঝারি এবং ৬ ডিগ্রির নিচে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বর্তমানে রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ চলছে, যা আগামী কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে। এতে ঠা-াজনিত রোগের প্রকোপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, গত সপ্তাহ থেকে তাপমাত্রা হ্রাস, ঘন কুয়াশা এবং হিমেল বাতাসের প্রভাবে ঠা-াজনিত জটিলতায় রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে শীতজনিত রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
হাসপাতালটির শয্যাসংখ্যা ১,২০০ হলেও বর্তমানে ভর্তি রোগীর সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে শীতজনিত রোগীর একটি বড় অংশ শিশু ও বয়স্ক।
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ও জরুরি বিভাগের ইনচার্জ ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস জানান, প্রতিদিন নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট এবং ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশু ও বয়স্ক রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। শীতের কারণে অন্যান্য রোগের চাপ কিছুটা কম থাকলেও ঠান্ডাজনিত রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, শীতে শিশু ও বয়স্কদের বাড়তি যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। ঠান্ডাকে উপেক্ষা করা যাবে না। পর্যাপ্ত গরম কাপড় পরা, ঘরে উষ্ণতা বজায় রাখা এবং অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। এছাড়া, শিশুদের ক্ষেত্রে মায়ের দুধ খাওয়ানো এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের ওপর জোর দেন তিনি।
হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, শিশু ওয়ার্ডে রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি। শয্যা সংকটের কারণে একই বেডে ২-৩ জন রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। গতকাল শিশু বিভাগের ৫৩টি শয্যার বিপরীতে চিকিৎসাধীন ছিল ১৪৩ জন শিশু। শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক শহীদা ইয়াসমিন জানান, ভর্তি শিশুদের বেশিরভাগই সর্দি, ব্রঙ্কিওলাইটিস, নিউমোনিয়া এবং ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। এছাড়া, অন্যান্য ওয়ার্ডে তুলনামূলকভাবে রোগীর চাপ কম থাকলেও মেডিসিন ওয়ার্ডে বয়স্ক রোগীদের শ্বাসকষ্টের সমস্যা বেড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহীর পাশাপাশি বগুড়া, নওগাঁ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালগুলোতেও শীতজনিত রোগীর চাপ বেড়েছে। বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৫০০ শয্যার বিপরীতে বর্তমানে ১,৮০০-এর বেশি রোগী চিকিৎসাধীন, অনেককে মেঝেতে রাখতে হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে ২৫০ শয্যার বিপরীতে ভর্তি রোগী সাড়ে ৩০০ থেকে পৌনে ৪০০। নওগাঁ সদর হাসপাতালে ১০০ শয্যার বিপরীতে ২০০-এর বেশি রোগী ভর্তি রয়েছেন। সর্বত্রই শীতজনিত রোগীর চাপ প্রকট হয়ে উঠেছে, যা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, শীত থেকে বাঁচতে পর্যাপ্ত গরম কাপড় ব্যবহার, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ এবং ঘরের ভেতরে উষ্ণতা বজায় রাখতে হবে।
এমন পরিস্থিতিতে নিম্নআয়ের মানুষদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে শীতবস্ত্র বিতরণ জোরদার করার দাবি উঠেছে। শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত থাকলে রোগীর চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
