নতুন পদ্ধতিতে পরিবেশবান্ধব চিমনি

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:১০ এএম

ইটভাটার কালো ধোঁয়া ও ক্ষতিকর গ্যাস দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে আছে। মিথেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রাস অক্সাইডের মতো গ্যাস বাতাসে মিশে তাপমাত্রা বাড়ানোর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে শ্বাসতন্ত্র, ত্বক ও ফসল। এমন বাস্তবতায় পরিবেশ দূষণ কমাতে ঠাকুরগাঁওয়ে প্রথমবারের মতো চালু হয়েছে পরিবেশবান্ধব কার্বো-পিউরিফিকেশন টেকনোলজি (সিপিটি)।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে নিজের ইটভাটার কাঠামো রূপান্তর করেছেন ঠাকুরগাঁওয়ের এমএ ব্রিক্স-৩ ইটভাটার স্বত্বাধিকারী আরিফুল ইসলাম জুয়েল। সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের বকেশেরহাট এলাকায় অবস্থিত এই ইটভাটাতেই পরীক্ষামূলকভাবে নতুন প্রযুক্তিটি চালু করা হয়েছে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ দূষণ কমছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিকভাবেও সুফল পাচ্ছেন ভাটার মালিক।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে ইটভাটা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়ায় আশপাশের এলাকা প্রায়ই ঢেকে যেত। শিশু ও বয়স্কদের শ্বাসকষ্ট বাড়ত, ফসলের পাতায় জমত কালো আস্তরণ। কার্বো-পিউরিফিকেশন টেকনোলজি চালুর পর সেই চিত্র অনেকটাই বদলেছে।

আকচা ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল হক বলেন, আগে ধানের পাতায় কালো আস্তরণ পড়ে যেত। জমিতে কাজ করলে শ্বাস নিতে কষ্ট হতো। এখন ধোঁয়া কম হওয়ায় ফসল আগের চেয়ে ভালো আছে।

একই এলাকার কৃষক মোস্তাফিজার রহমান বলেন, ‘আগে আলু ও সবজির ক্ষতি হতো, এখন সেই সমস্যা নেই। এবার ফলন ভালো হবে বলে আশা করছি।’

কার্বো-পিউরিফিকেশন টেকনোলজি সম্পর্কে আরিফুল ইসলাম জুয়েল বলেন, ‘আধুনিক এই চিমনি আটটি চেম্বারের মাধ্যমে কাজ করে। চিমনি দিয়ে বের হওয়া ধোঁয়া প্রথমে আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াটার স্প্রে চ্যানেলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। পানির স্প্রের মাধ্যমে ধোঁয়ার ভেতরের কার্বন কণা ও ক্ষতিকর উপাদান আটকে যায়। পরিশোধনের পর ধোঁয়ার পরিবর্তে সাদা ও শীতল বাষ্প আকারে তা বায়ুমন্ডলে মিশে যায়। এতে ধোঁয়ার তাপ ও ঘনত্ব দুটোই কমে আসে।’

দেশীয় এই প্রযুক্তির উদ্ভাবক কার্বো-পিউরিফিকেশন টেকনোলজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী হোসেন। প্রযুক্তিটি উদ্ভাবনের পর ২০২১ সালে ঝালকাঠি জেলার আলীনগর এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়। সেখানে সফলতার পর বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নজরে আসে। পরে এই প্রযুক্তিটি নিয়ে নানা গবেষণার পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে ব্যবহারের জন্য সম্মতি দেওয়া হয় বলে জানান প্রযুক্তির উদ্ভাবক আলী হোসেন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালে রাজধানী ঢাকার আমিন বাজার, ময়মনসিংহ, জামালপুর, ঝালকাঠি জেলা থেকে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ইট উৎপাদন হয়েছে। এ বছর ঠাকুরগাঁও জেলায় শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১৮ থেকে ২০টি ইটভাটায় কার্বো-পিউরিফিকেশন টেকনোলজির মাধ্যমে ইট উৎপাদন হচ্ছে বলে জানান তিনি।

আলী হোসেন আরও বলেন, ২০২৩ সালের ৪ জুন উদ্ভাবিত সিপিটি শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে পেটেন্ট প্রাপ্ত হয় এবং ২০২১ সালে গ্রিন আইবি চ্যাম্পিয়ন অ্যাওয়ার্ড পায়। এ ছাড়াও ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এ বছরের ২৮ জুন, খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৪ সালের ১৪ মে এবং পরিবেশ অধিদপ্তরে ২০২২ সালের ১১ আগস্ট নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় এই প্রযুক্তিটি দেশের পরিবেশের ওপর ক্ষতিকারক নয় বলে গবেষণায় উঠে আসে।

ইটভাটাটি পরিদর্শন শেষে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ডা. মুরাদ আহম্মেদ ফারুক বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কার্বন নিঃসরণ কমানো জরুরি। ইটভাটাগুলো দেশের বায়ুদূষণের বড় উৎস। এই খাতে কার্বো-পিউরিফিকেশন টেকনোলজির ব্যবহার করা গেলে বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে। ইটভাটা শিল্প পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব না হলেও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এর ক্ষতিকর প্রভাব অনেকাংশে কমানো যায়। এমএ ব্রিক্স-৩ এর উদ্যোগ সময়োপযোগী ও অনুসরণযোগ্য।’

রংপুর বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক নূর আলম বলেন, ‘ইটভাটা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া ও ক্ষতিকর গ্যাস বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান কারণ। এসব গ্যাস পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। কার্বন পিউরিফিকেশন প্ল্যান্টের মতো পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়ানো গেলে কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। এতে বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকবে। পাশাপাশি কৃষিজমি ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত