সৌদি আরবের জেদ্দায় রবিবার রাতটা ফুটবলপ্রেমীরা মনে রাখবে অনেক দিন। কিং আব্দুল্লাহ স্পোর্টস সিটি স্টেডিয়ামে সেই রাতে বসেছিল বিশ্ব ফুটবলে প্রার্থিত দ্বৈরথগুলোর একটি। স্প্যানিশ দুই জায়ান্ট মুখোমুখি হয়েছিল সুপার কাপের ফাইনালের। মর্যাদার লড়াইয়ে সব আলো শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিয়েছেন রাফিনহা। তার জোড়ায় রিয়াল মাদ্রিদকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে ১৬তম বারের মতো মর্যাদার শিরোপা জিতেছে বার্সেলোনা। রাফিনহার রাতে অবশ্য অন্যভাবে আলোচনায় এসেছেন মাদ্রিদ তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে। তার একটা ভিডিও নেটিজেনদের চোখে আসা মাত্রই অন্তরজালে উঠেছে সমালোচনার ঝড়। স্প্যানিশ গণমাধ্যম মার্কা লিখেছে, প্রথা অনুযায়ী সুপার কাপ ফাইনাল শেষে বিজিত দল দাঁড়িয়ে বিজয়ী দলকে গার্ড অব অনার দিয়ে থাকে। রিয়ালের ফুটবলাররাও সে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন পুরস্কার বিতরণী শেষে। তবে সতীর্থদের সেটা করতে বারণ করেন ক্ষিপ্ত এমবাপ্পে। পরে ফরাসি তারকার কথাতেই রীতি না মেনে মাঠ ত্যাগ করে রিয়াল মাদ্রিদ।
যেমনটা হওয়ার কথা, জেদ্দার রাতে যেন সেটাই হয়েছে। ম্যাচের পরতে পরতে ছিল রোমাঞ্চে ঠাসা। বিশেষ করে প্রথমার্ধের শেষ ভাগে হয় চারটি গোল। ম্যাচের শুরুতে দুদলই সমানতালে খেললেও বিরতির আগে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ নেয় বার্সেলোনা। ম্যাচের ৩৬ মিনিটে এর পুরস্কার পায় কাতালানরা। রাফিনহা বক্সে ঢুকে নিচু শটে দূরের পোস্টের কোণায় বল জড়িয়ে দলকে এগিয়ে নেন। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে রিয়াল মাদ্রিদ সমতায় ফেরে। মাঝমাঠের কাছ থেকে বল পেয়ে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ডানপ্রান্ত ধরে দ্রুত আক্রমণে ওঠেন। বার্সেলোনার দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে নিখুঁত শটে দূরের পোস্টের কোণায় বল পাঠান। তবে প্রথমার্ধের নাটক এখানেই শেষ হয়নি। দুই মিনিট পর পেনাল্টি বক্সে জায়গা পেয়ে রবার্ট লেভানডফস্কি নিখুঁত চিপে আবারও বার্সেলোনাকে এগিয়ে দেন। তবে বিরতির বাঁশি বাজার ঠিক আগমুহূর্তে আবারও উল্লাসে মেতে ওঠে রিয়াল সমর্থকরা। রিয়ালের একটি কর্নার থেকে বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে গোললাইন থেকে রাফিনহা ঠেকালেও ফিরতি বল পেয়ে যান গনসালো গার্সিয়া। তার শট পোস্ট ও ক্রসবারে লেগে শেষপর্যন্ত গোললাইন পার হলে আবারও সমতায় ফেরে ম্যাচ, ২-২ স্কোরলাইনে দুই দল বিরতিতে যায়।
বিরতি থেকে ফিরে আক্রমণ-প্রতি আক্রমণে চলতে থাকে খেলা। এ ম্যাচে শুরু থেকে ছিলেন না এমবাপ্পে। হাঁটুর চোট থেকে সদ্য সেরে ওঠায় তাকে রাখা হয়নি শুরুর একাদশে। তবে তিনি যখন মাঠে আসেন ততক্ষণে ম্যাচের লাগাম টেনে নিয়েছে বার্সা। ৭৩ মিনিটে আবারও ম্যাচের নায়ক হন রাফিনহা। বক্সের ওপরে বিপজ্জনক জায়গায় ঢুকে শট নিতে গিয়ে সামান্য পিছলে গিয়েছিলেন, তবে তার শটটি রিয়ালের এক ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে দিক বদলায়, থিবো কোর্তোয়া গ্লাভস ফাঁকি দিয়ে জালে জড়ায়। এর তিন মিনিটর পর এমবাপ্পে মাঠে নামলেও খেলায় উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব ফেলতে পারেননি। ম্যাচের ৯০ মিনিট পেরোনোর পর আবারও উত্তেজনা বাড়ে। এমবাপ্পেকে ফাউল করায় ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ংকে দেখতে হয় লাল কার্ড এবং বার্সেলোনা ১০ জনে পরিণত হয়। তবে বাকি সময় একজন বেশি নিয়ে খেলার সুবিধা কাজে লাগাতে পারেনি রিয়াল মাদ্রিদ। শেষ মুহূর্তে আলভারো কারেরাস ও ফ্রাঙ্কো মাসতান্তুয়োনোর কাছ থেকে নেওয়া কাছাকাছি দুটি শট দুর্দান্তভাবে রুখে দেন বার্সা গোলকিপাল জোয়ান গার্সিয়া। এর ফলে বার্সেলোনা জিতে নেয় তাদের ১৬তম স্প্যানিশ সুপার কাপ শিরোপা।
এল ক্লাসিকোর পর রীতি মেনে বিজিত দল বিজয়ী দলকে গার্ড অব অনার দিয়ে থাকে। তবে একটা ভিডিও উসকে দিয়েছে বিতর্ক। ট্রফি প্রদান অনুষ্ঠানের সময় বার্সেলোনা সমর্থকদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন এমবাপ্পে। তাদের অভিযোগ, রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা বিজয়ী দল বার্সেলোনাকে গার্ড অব অনার দিতে তার সতীর্থদের বাধা দিয়েছেন। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ২৭ বছর বয়সী এমবাপ্পে মাঠ ছাড়ার আগে রিয়াল মাদ্রিদের কয়েকজন সতীর্থের সঙ্গে কথা বলছিলেন। মার্কার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এমবাপ্পে সেখানে না থাকার সিদ্ধান্ত নেন এবং দলের বাকিদের দ্রুত মাঠ ছাড়তে তাগাদা দেন, যাতে চ্যাম্পিয়ন দলের শেষ আনুষ্ঠানিকতার মুহূর্তগুলো তাকে ও তার সতীর্থদের দেখতে না হয়।
শিরোপা জয়ের পর বার্সার কোচ হ্যান্সি ফ্লিক শিষ্যদের প্রশংসায় ভাসিয়েছেন, ‘পুরো ম্যাচ জুড়েই আমরা আমাদের নিজস্ব ধারায় খেলেছি। এটা সহজ ছিল না, তবে আমরা দল হিসেবে একসঙ্গে লড়াই করেছি। আর সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’ ফ্লিক রাফিনহার প্রশংসা করে আরও বলেন, ‘তার মানসিকতা অবিশ্বাস্য। সে প্রথম সুযোগটি কাজে লাগাতে পারেনি, তবে এরপরই সে গোল করে ১-০ করে দেয়। সে আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছে। মাঠে রাফা সব সময়ই অনেক বেশি তীব্রতা ও উদ্যম নিয়ে খেলে।’
রিয়াল মাদ্রিদের কোচ জাবি আলোনসো হারের পরও শিষ্যদের খেলায় গর্বিত, ‘আমাদের অনুভূতি মিশ্র। একদিকে শিরোপা জিততে না পারার হতাশা, অন্যদিকে দল যেভাবে সর্বস্ব উজাড় করে খেলেছে, তাতে গর্বও আছে। আমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছি। ফাইনালটি ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলেছে। দল শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে গেছে এবং খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিল। দল দারুণ মানসিকতা ও অঙ্গীকার দেখিয়েছে। আমি জানতাম, এমন সময় আসবে যখন আমাদের বল ছাড়া খেলতে হবে, তখন ধৈর্য, নিয়ন্ত্রণ ও নিজেদের পরিকল্পনার ওপর দৃঢ় বিশ্বাস ধরে রাখতে হবে।’
