এই বিষয়টা নিয়ে লিখতে গিয়ে প্রথমেই মনে হলো এই লেখাটাও কি বৈষম্যের ঊর্ধ্বে যাবে! কারণ, ভেতরে ভেতরে আমরা অনেকে বৈষম্যের চাষাবাদ করি। আচার, ব্যবহার এবং কথাবার্তাতেও। দ্বিতীয়ত, মানুষ স্বভাবত অনেকে স্বার্থপর। নিজস্ব চিন্তাভাবনা এবং পছন্দের বাইরে সবকিছু মনে হয় ভুল। আমরা এও জানি, কোনো মানুষ জেনেশুনে তার স্বার্থের বিরুদ্ধে কিছু করে না। ফলে আমরা কোনো ব্যাপারে একমত যত হই, তার চেয়ে শতগুণ দ্বিমত পোষণ করি। দুটোতেই এক ধরনের বৈষম্য থাকে। মানুষ সবাই সমান। সবার অধিকার সমান। কথাগুলো তারা সেমিনার, লেখালেখি ও পাবলিক বক্তৃতায় বলেন। কিন্তু কাজে প্রমাণ করতে চেষ্টা করেন একটু ভিন্নভাবে। তারা সমাজের উঁচু শ্রেণির মানুষ। এটা এলিট ও নন-এলিটের পার্থক্য। এটিও এক প্রকার বৈষম্য। সামাজিক মাধ্যমের সুনামির কারণেও কথায় কথায় আমরা সব ব্যাপারে একটা মতামত দিই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই মতামতগুলো নেতিবাচক। কাউকে গালাগালি করা বা কারোর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হওয়া, উভয়ই বৈষম্যমূলক আচরণের দৃষ্টান্ত। এই শ্রেণির মানুষের মধ্যে আত্মপ্রচারের ব্যাপার প্রচ- রকম ক্যানসারের মতো। তারা অন্যকে উপদেশ দেন, কিন্তু নিজে কোনো উপদেশ নেন না। এই বিশেষ মানুষ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উদ্ধত, বেয়াদব এবং অহংকারী। দেশে ও বিদেশে এদের চোখে পড়ে। এরা মানসিকভাবে বৈষম্য চিন্তা এবং বিশেষ শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করলেও, কথায় কথায় ‘বৈষম্যের’ বিরুদ্ধে কথা বলেন। কিন্তু তারা জানেন না যে, তারাও অন্ধ।
ধর্ম বিশ্বাস ছাড়া জ্ঞান, এক ধরনের বৈষম্য, অসম্পূর্ণ। পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত বিজ্ঞানী এবং প-িতজন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে স্বীকার করেছেন যে, ধর্ম বিশ্বাস মানুষের নীতি নৈতিকতার প্রধান চাবিকাঠি। ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও এর সঠিক চর্চা ছাড়া সমাজ ও রাষ্ট্রে বৈষম্যমুক্তি ঘটতে পারে না। অবশ্য ব্যতিক্রম কোথাও থাকতে পারে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অনেক চেনা ও অচেনা মুখ সামাজিক পর্দা এবং জাতীয় প্রচারে অনেক বেশি আসেন। এদের একটা অংশ উঠে পড়ে লেগেছে, সমাজকে বৈষম্যমুক্ত করতে বা এর পক্ষে কথা বলতে। যদি প্রশ্ন হয়, বাংলাদেশে ১৯৭২ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত কোথায় কতটা বৈষম্যমুক্ত সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, ও মানবিকতা ছিল? কয়েকজন ব্যতিক্রম ব্যক্তিত্ব বাদে, আমরা অধিকাংশই নানা ধরনের বৈষম্যের পক্ষে। হয় কথায়, নয় কাজে অর্থনীতি ও রাজনীতিতেও। বাংলাদেশে একজন তার ব্যক্তিগত কলামে লিখেছেন বাংলাদেশ থেকে নাকি সব রকমের আনন্দ, উৎসব উধাও হয়ে গেছে! আনন্দ নাকি এখন কোথাও নেই। এ ধরনের লেখা মূলত আরেক ধরনের বৈষম্যমূলক চিন্তার প্রতিনিধিত্ব করে। যুক্তরাষ্ট্রেও অনেক লেখা মাঝে মাঝে চোখে পড়ে। লেখাগুলো পড়লে মাথা ঠিক থাকে না, তবু মাথা ঠিক রাখতে চেষ্টা করি, বিখ্যাত দার্শনিক রাসেলের সেই কথাটা মনে করি। শুয়োরের সঙ্গে খেলতে গেলে দুজনেই নোংরা হবে। এতে আনন্দ খুঁজে পায় শুয়োর। তাই চেষ্টা করি অযথা কোনো বিতর্কে না জড়াতে। আসলে প্রগতিশীলতার সংজ্ঞা কী? সামনের কথা চিন্তা করা, বৈষম্য থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রকে দূরে রাখা। অধিকাংশ প্রগতিশীল ব্যক্তি কি তা করেন! বিশেষ করে, বাংলাদেশের অধিকাংশ তথাকথিত পন্ডিত, বুদ্ধিজীবী এবং সুশীল সমাজ। এরা অনেকেই বৈষম্যের পক্ষে কোনো না কোনোভাবে দাঁড়িয়েই থাকেন। অথচ তাদের মুখ থেকেই শুনতে হয় বৈষম্যমুক্ত সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনীতির কথা! একজন মানুষ কখনো শতভাগ খাঁটি হতে পারেন না। ন্যায়বিচারও করতে পারেন না। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে ন্যায় ও অন্যায় ব্যক্তির ব্যক্তিগত দৃষ্টি, চিন্তাভাবনা ও বৈষম্যমূলক সমাজ ও রাজনীতিনির্ভর। তার ন্যায়-অন্যায় বোধের কৃষিকাজ শুরু হয় ব্যক্তিগত, পরিবার, শ্রেণি, শিক্ষা ও প্রজ্ঞার মধ্য দিয়ে। এরা ভুলে যায় নিজেদের বিশেষ মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে আরও অনেক মানুষকে ‘অবিশেষ’ বানায় ও তাদের ছোট করেন। এরা ভুলে যায়, নিজেকে বড় করতে গিয়ে এরা অন্যকে ছোট করেন। প্রকারান্তরে ‘অবিশেষ’ ব্যক্তি হন। উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, বেগম খালেদা জিয়া এবং তাকে অপমান করে যারা তাকে ছোট করেছিলেন। আজকে তারা কোথায় আর বেগম খালদা জিয়া কোথায়? নিজের দল, বিশ্বাস এবং বোধকে অন্যদের থেকে আলাদা করতে নিজেরটাকেই শুধু প্রাধান্য দেয় এরা। এটাও কি বৈষম্যমূলক ফিলোসফির বাইরে?
পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বৈষম্যমূলক সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার মধ্য থেকে হঠাৎ করে রাজনীতি ও অর্থনীতিকে বৈষম্যমুক্ত করি কীভাবে! মানসিকতার পরিবর্তন না হলে, শিক্ষার পরিবর্তন না হলে, উৎপাদন সম্পর্কের পরিবর্তন না করে, বৈষম্যমুক্ত সমাজ কখন কোথায় কে গড়েছে? বর্তমান বিশ্বের কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রকে বলতে পারি কি, এরা বৈষম্যমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র হয়েছে? আমি নিজে বৈষম্যের ‘ভোগী’ হয়ে অন্যকে বৈষম্যমুক্তির বয়ান দিই! ঠিক হয় কি? আমাদের দেশে আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের ব্যাপারে কেউ কেউ বলছে, নির্বাচন হবে না। হলেও সেটা নির্ভেজাল, গণতান্ত্রিক, সুস্থ ও বৈষম্যমুক্ত হবে না। সে রকম নির্বাচন হতে আমরা নাগরিকরাও কি রেডি! বিগত ৫৪ বছরেও এমন কোনো নির্বাচন হয়েছিল কি একেবারেই সুষ্ঠু, সুন্দর ও ঝামেলামুক্ত! নির্বাচন হতে নাকি একটা অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ দরকার। এই অন্তর্ভুক্তির বিষয়টাও উদ্দেশ্যমূলক। যে রাজনৈতিক দল বিগত ১৫ বছর নানাভাবে রাষ্ট্র ও সমাজকে দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত করেছে, হত্যা-খুন-গুম করেছে, সারা দেশকে এক দল ও এক নেতৃত্বে রাখতে চেষ্টা করেছে, দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনই সেই দলের পুনরায় ক্ষমতায় আসা বা ক্ষমতার কিছুতে যুক্ত হওয়াকে পছন্দ করে! গণতন্ত্রের অর্থ যদি হয়, সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত সেক্ষেত্রে সব সংখ্যাগরিষ্ঠই কি বৈষম্যের বাইরে? আবার সংখ্যা কম হলেই সেটা বৈষম্যমুক্ত! এরও কোনো যুক্তি নেই। সমাজ ও রাষ্ট্রকে সত্যিকার ন্যায় আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠা করতে সব নাগরিকের অনেক বড় মন ও একতার পরিচয় দিতে হয়। বিনয় ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের পরিচয় দিতে হয়। সামাজিক ন্যায়বিচার ও আদর্শ গ্রোসারিতে গিয়ে ‘হাফ অ্যান্ড হাফ’ মিল্ক খোঁজা না। মানুষ শুরু থেকেই সংকটে। সংকট মুক্তির জন্য যারা অগ্রসর হন বা আন্দোলন করেন, অনেক সময় এদের মধ্যে তারাই বিশেষত্ব পান ও বিশেষভাবে নোটিস হয়ে আরেক বৈষম্যের শিকার হন। নিজেরাও তখন সংকট সৃষ্টি করেন কোনো না কোনোভাবে। তাদের মূল লক্ষ্য, বৈষম্য মুক্তি না। ক্ষমতার ভাগাভাগি। এই ক্ষমতার ভাগাভাগির বিষয়টা কিন্তু কেবল ক্ষমতার চেয়ারে বসা না। চেয়ারের আশপাশে থাকা এবং ক্ষমতাকে নিজেদের শ্রেণিস্বার্থে প্রভাবিত করা। নিজের একটা সুবিধাজনক ‘জোনে’ থাকার চেষ্টা করা এটাও একটা বৈষম্য।
অতীতেও বৈষম্যের বিপরীতে সাম্য বা সমতা বাস্তবে ছিল না। নিকট ভবিষ্যতেও মানুষের সমাজ, রাষ্ট্র ও এর বাস্তবতায় কোথাও সেই অর্থে বৈষম্য মুক্তির স্বপ্ন দুরাশা। এটা নিয়ে আমরা যত বেশি নিজেদের মধ্যে জটিলতা ও দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করি, ততবেশি এর মুক্তি ও সমাধান আরও দুরূহ হয়ে যায়। এটাও বাস্তবতা। আদিকাল থেকে শুরু করে, বর্তমানের আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিহাস একই কথা বলে। একটা কাক যতটা আরেকটা কাককে সহজে মেনে নেয়, মানুষের মতো শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান প্রাণী কিন্তু তা নেয় না। বিশেষ করে, যেখানে তার স্বার্থের সংঘাত হয়। এটাই বাস্তবতা। ইচ্ছা থাকতেই পারে, এই ইচ্ছাটুকুর বাস্তবতা আছে বলেই কোথাও, কোথাও আমরা বৈষম্যকে ঘৃণা করি। এর মুক্তি ও অবসান চাই। হয়তো দেখা যাবে শত বছর পর পৃথিবীতে বৈষম্য বলে কিছু তখন থাকবে না। এই আশাটুকু থাকতেই পারে। তা বাস্তবায়ন হোক বা না হোক, স্বপ্নটুকু থাক। এর বিরুদ্ধে লড়াই চাই, কিন্তু পারস্পরিক ঘৃণা, বিদ্বেষ ও উদ্দেশ্যমূলক শ্রেণিস্বার্থের বৈষম্য চাই না। সংক্ষেপে আমাদের নিকট ভবিষ্যতে বৈষম্যমুক্তির সম্ভাবনা কম এই কারণে যে, ক) আমরা মানুষ, ভীষণ স্বার্থপর। খ) আমরা মানুষ, যেকোনো আলোচনার চাইতে নেতিবাচক সমালোচনায় বেশি উৎসাহ পাই। গ) গতানুগতিকে যতটা পছন্দ করি, পরিবর্তনকে না। ঘ) আমরা হিংসায় যতটা পারদর্শী ভালোবাসায় না। ঙ) ভাঙতে যতটা একত্রিত হই, গড়তে না। চ) রাতারাতি সব চাই। ধৈর্য, সহনশীলতা, সহমর্মিতা ও একতায় আমাদের ভূমিকা খুবই সীমিত ও নগণ্য। ছ) আমরা আশঙ্কা ও সন্দেহে যতটা অভ্যস্ত আশ্বাস ও বিশ্বাসে তত না। এসব বাস্তবতা। বৈষম্যমূলক বাস্তবতা।
অনেকে লক্ষ্য করছি যে, বাংলাদেশে জুলাই (২০২৪) উত্তর রাজনীতিতে হঠাৎ করে একটা শ্রেণি বা গোষ্ঠী দাঁড়িয়েছেন, যারা সব ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের তীব্র সমালোচক । তাদের সমালোচনার উদ্দেশ্য কি, বৈষম্যমুক্তি সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা? নাকি একটা সৎ ও বস্তুনিষ্ঠু নির্ভেজাল নির্বাচন দেখা? এদের শ্রেণি চরিত্র কিন্তু তা বলে না। সমাজে এরাও বিশেষভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত এক বিশেষ শ্রেণি। তাদের এখন প্রধান লক্ষ্য পরিবর্তনের মুখে, বিভিন্ন অন্তরায় সৃষ্টি করা। এরাও বৈষম্যের প্রতিনিধিত্ব করেন চৌকসভাবে। পোশাকে, চেহারা এবং সামাজিক শ্রেণি অবস্থানেও এরা কেউ সাধারণ মানুষের কাতারে না। এদের কাছে বৈষম্য মুক্ত মানে, নিজের পথে সব রকম অন্তরায় থেকে মুক্ত থাকা। সব রকম প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকা। এক বিশেষ শ্রেণি হিসেবেই এরা সমাজ ও রাষ্ট্রে বাঁচতে চান। সকাল-সন্ধ্যা অপপ্রচারে লিপ্ত থাকেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তারাই বৈষম্য মুক্তির আশা করেন রাত পোহালে। যেকোনো বিশেষত্ব বা বিশেষ কিছু, বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে বৈষম্য সৃষ্টির এক মাতৃগর্ভ। পৃথিবীর কথিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আরেক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টকেও তুলে নিয়ে আসলেন। তারপরও এরা গণতন্ত্রের কথা বলে ও বলবে। বৈষম্য কোথায় নেই! শুধু গলাবাজি করে সমাজ, রাষ্ট্র বা কোনো প্রতিষ্ঠানকে বৈষম্যমুক্ত রাখা যাবে কি! আমাদের অভিজ্ঞতা বলে আইন যিনি তৈরি করেন, সবার আগে তিনিই আইন ভঙ্গ করেন। এই বৈষম্য আমাদের বাস্তবতা। সহজ মুক্তির পথ আছে, তবে আমরা সেই পথে হাঁটব না। বৈষম্য সভ্যতার শুরুতেও ছিল, এখনো আছে, হয়তো আগামীতেও থাকবে। বৈষম্যের ইতিবাচক দিক, ভালো ও মন্দের মাঝে পার্থক্য খুঁজে বের করতে সাহায্য করে। আমরা এখন কোন পথে হাঁটব, সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে। অপেক্ষায় থাকব, সেখানে আদৌ কোনো বৈষম্য দৃশ্যমান হয় কিনা?
লেখক: রাজনীতি ও সমাজ বিশ্লেষক
