পর্যটকের উপভোগের ভুক্তভোগী কৃষক

আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:০০ এএম

বর্ষায় সুনামগঞ্জের হাওরের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসা পর্যটকদের ফেলে যাওয়া ভাঙা কাচের বোতল এখন কৃষকদের জন্য ভয়াবহ আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। জমিতে কাজ করতে গিয়ে কাদামাটির ভেতর লুকিয়ে থাকা এসব কাচের টুকরোয় একের পর এক কৃষক ও শ্রমিকের হাত-পা কেটে গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। ধানের চারা রোপণের সময় কাদামাটির মধ্যে লুকিয়ে থাকা ভাঙা কাচের বোতল চোখে দেখা না গেলেও প্রতিদিনই কৃষকদের হাত-পায়ে ক্ষত তৈরি করছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষাকালে হাওরে আসা অনেক পর্যটক নৌকায় বসেই মদ-বিয়ার পান করেন এবং খালি কাচের বোতল ও প্লাস্টিকের বর্জ্য হাওরের পানিতে ফেলে দেন। ফলে চাষাবাদ করতে গিয়ে কৃষকদের হাত-পা নিয়মিত কেটে যাচ্ছে। এটি অত্যন্ত ভয়াবহ পরিস্থিতি।

তাহিরপুর উপজেলার উত্তরশ্রীপুর ইউনিয়নের কলিসাজুরি গ্রামের কৃষক হযরত আলি বলেন, ‘পর্যটকদের এখানে আসা অবশ্যই ভালো বিষয়। আমরাও চাই তারা আসুক। কিন্তু তারা এসে মদ-বিয়ার খেয়ে কাচের বোতল পানিতে ফেলে যায়। পরে শুকনো মৌসুমে যখন আমরা ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করি, তখন লাঙলের আঘাতে বোতল ভেঙে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে বোরো ধান রোপণ, চারা বাছাই কিংবা অন্য কৃষিকাজের সময় কৃষকদের হাত-পা কেটে যায়, অনেকে মারাত্মকভাবে আহত হন। আমরা এসব চাই না। তারা খাবেন, এতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু কাচের বোতল নিজেদের হেফাজতে রেখে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা উচিত। হাওরে কিংবা আমাদের জমিতে ময়লা-আবর্জনা ফেলা আমাদের জন্য খুবই ক্ষতিকর।’

বড়দল দক্ষিণ ইউনিয়নের বড়দল পুরানহাটি গ্রামের বাসিন্দা বশির মিয়া জানান, মাঠিয়ান হাওরে বোরো ধান রোপণের সময় হঠাৎ কাচের বোতলের ভাঙা টুকরোর আঘাতে তার পা কেটে যায়। ২৫ দিন অতিবাহিত হলেও কাটা পায়ের ঘা এখনো শুকায়নি।

এ ছাড়া গত কয়েক দিনে উপজেলার প্রায় অর্ধশতাধিক কৃষক ও কৃষি শ্রমিক ভাঙা বোতলের কারণে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে মাঠিয়ান হাওরসংলগ্ন বড়দল গ্রামের ফজলুল বারি, ফয়জুন নুর, হালিম মিয়া, জুয়েল মিয়া, আব্দুর রব; সমসার হাওরসংলগ্ন শ্রীপুর গ্রামের কৃষক আলিম মিয়া, হারুন মিয়া এবং ট্যাকেরঘাট হাওরসংলগ্ন মাটিকাটা গ্রামের কৃষক জমির উদ্দিন, রইস মিয়াসহ অনেকেই রয়েছেন।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, পর্যটকদের এই অসচেতন আচরণ হাওর এলাকার জীবন-জীবিকাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমীর রেজা বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে কৃষকরা জমিতে ব্যাপকভাবে কাচের বোতল দেখতে পাচ্ছেন। এসব বোতলের কারণে অনেকের পা কেটে যাচ্ছে এবং চরম ঝুঁকি নিয়ে মাঠে কাজ করতে হচ্ছে। এগুলো মূলত পর্যটকদের ফেলে যাওয়া কাচের বোতল, যা কোনোভাবেই দায়িত্বশীল পর্যটনের পরিচয় বহন করে না।’

 তিনি আরও বলেন, ‘পর্যটকরা যদি দায়িত্বশীল আচরণ না করেন, তাহলে এ ধরনের দুর্ঘটনা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। পর্যটকদের আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। কোনোভাবেই কাচের বোতল পানি, হাওর কিংবা জমিতে ফেলা যাবে না। পাশাপাশি মাঝি, গাইড এবং প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও দায়িত্ব নিয়ে এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে।’

কাশমির রেজা আরও যোগ করেন, ‘দায়িত্বশীল পর্যটন নিশ্চিত করা না গেলে টাঙ্গুয়ার হাওর কেন্দ্রিক এই পর্যটন এলাকা স্থানীয় মানুষের কোনো উপকারে আসবে না এবং তারা এটি মেনে নেবে না। তাই সরকারকে অতি দ্রুত বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে এবং কৃষকরা যেন ভবিষ্যতে আর কাচের বোতলের কারণে দুর্ঘটনার শিকার না হন, সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’

এ বিষয়ে প্রশাসনও এখন সক্রিয় হয়েছে। পর্যটকবাহী নৌচালকদের নিয়ে সচেতনতামূলক কর্মশালা আয়োজনের কথা জানিয়েছে তাহিরপুর উপজেলা প্রশাসন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান মানিক বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি এবং হাউজবোট-সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করব। যা ঘটেছে তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। আগামী মৌসুমের শুরু থেকেই আমরা এসব বিষয় নিয়মিত মনিটরিং করব। পাশাপাশি কাচের বোতল নিক্ষেপের ঘটনায় কোনো হাউজবোট জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।’

হাওরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসা পর্যটকদের অসচেতনতার খেসারত এখন দিচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পুরো হাওরভিত্তিক কৃষি ও পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত