বিএনপি কর্মীসহ বিভিন্ন স্থানে ৬ খুন

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪৫ এএম

দেশের বিভিন্ন স্থানে ৬ জন খুন হয়েছে। এর মধ্যে গতকাল শুক্রবার ময়মনসিংহ-১ আসনে এক স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক এক বিএনপি কর্মীকে ছুরি মেরে হত্যার করা হয়। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে মোবাইল চুরিকে কেন্দ্র করে দুজন খুনের ঘটনা ঘটেছে। কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বের জের ধরে প্রতিপক্ষের গুলিতে দুজন নিহত হয়েছে। কক্সবাজারের টেকনাফে গুলিতে এক তরুণী নিহত হন। বিস্তারিত আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

ময়মনসিংহে বিএনপি কর্মী খুন : ময়মনসিংহ-১ আসনে এক স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক এক বিএনপি কর্মীকে ছুরি মেরে হত্যার করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে ধোবাউড়া উপজেলার ঘোষগাঁও ইউনিয়নের এরশাদ বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। অভিযোগ উঠেছে, বিএনপির প্রার্থীর সমর্থকদের হামলায় তিনি নিহত হয়েছেন। ঘটনার পরপরই পুলিশ দুজনকে আটক করেছে।

নিহত মো. নজরুল ইসলাম (৪০) ঘোষগাঁও ইউনিয়নের বাকপাড়া গ্রামের বাসিন্দা।

আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য সালমান ওমর।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার বিকেলে এরশাদ বাজার এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমরের একটি নির্বাচনী কার্যালয়ের উদ্বোধন করা হয়। কার্যালয় উদ্বোধনের কিছুক্ষণ পর সন্ধ্যা ৬টার দিকে সেখানে বিএনপির প্রার্থীর সমর্থকরা হামলা চালান। এ সময় কার্যালয়ের সামনে অবস্থান করা নজরুল ইসলামকে ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে তাকে উদ্ধার করে ধোবাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর বলেন, আমার নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধনের কিছুক্ষণের মধ্যেই বিএনপি দলীয় প্রার্থীর সমর্থকরা হামলা চালায়। তাদের ছুরিকাঘাতে আমার এক কর্মী নিহত হয়েছেন। এ বিষয়ে ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীর নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে বিএনপি প্রার্থীর লোকজন হামলা চালিয়ে একজনকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে। ঘটনার পরপরই দুজনকে আটক করে পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নাঙ্গলকোটে গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বে প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত ২ : কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বের জেরে প্রতিপক্ষের গুলিতে দুজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। গতকাল শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে উপজেলার বক্সগঞ্জ ইউনিয়নের দক্ষিণ আলীয়ার গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে যৌথ বাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। নিহতরা হলেন দক্ষিণ আলীয়ার গ্রামের মৃত সালামত উল্লাহর ছেলে ছালেহ আহাম্মদ মেম্বার (৬৭) ও আবুল খায়েরের ছেলে আনোয়ার হোসেন নয়ন (৪০)। আহতদের মধ্যে রয়েছেন সোহাগ, কামাল, আবদুর রাজ্জাক, ইয়াছিন, জাহিদুল ইসলাম, আলাদ্দিন, আব্দুর রব, মামুন ভূঁইয়া, রোকম আলী, মনির আহম্মদ, নিজাম উদ্দিন, মহিন উদ্দিন, খোরশেদ ও নেছার উদ্দিন। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় সাতজনকে নাঙ্গলকোট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

এলাকাবাসী জানায়, প্রায় ৭০ বছর ধরে আলাউদ্দিন মেম্বার ও ছালেহ আহাম্মদ মেম্বার গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে আসছে। এর জের ধরে গত বছর ৩ আগস্ট আলাউদ্দিন মেম্বার নিহত হন। ওই ঘটনার পর দুই গোষ্ঠীর অন্তত ৬০ থেকে ৭০টি পরিবারের শতাধিক মানুষ গ্রামছাড়া ছিলেন। প্রায় পাঁচ মাস পর গত ৯ জানুয়ারি ছালেহ আহাম্মদ মেম্বার গোষ্ঠীর কিছু লোকজন বাড়িতে ফেরেন। এরপর থেকেই তাদের বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শুক্রবার সকালে প্রবাসী নয়নের বাড়িতে নাশতা খাচ্ছিলেন ছালেহ আহাম্মদ মেম্বার গোষ্ঠীর লোকজন। হঠাৎ প্রতিপক্ষের প্রায় ৩০০ জন ব্যক্তি আগ্নেয়াস্ত্র, বোমা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় অন্তত আটটি বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়। হামলায় ছালেহ আহাম্মদ মেম্বারকে গুলি ও হাত-পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়। আর প্রবাসী আনোয়ার হোসেন নয়নকে কুপিয়ে ও গুলি করে গুরুতর আহত করা হয়। পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক দুজনকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত ছালেহ মেম্বারের ছেলে আহত মামুন বলেন, আলাউদ্দিন মেম্বার হত্যাকা-ের পর প্রায় ছয় মাস বাড়িছাড়া ছিলাম। সম্প্রতি বাড়িতে ফিরলে আবারও হুমকি শুরু হয়। ঘটনার দিন সকালে পরিকল্পিতভাবে আমাদের ওপর হামলা চালিয়ে আমার বাবা ও নয়নকে গুলি করে হত্যা করে আলাউদ্দিন মেম্বারের লোকজন। নিহত নয়নের ছেলে ফয়সাল আহম্মদ বলেন, বাবা প্রবাস থেকে গোষ্ঠীগত মীমাংসার জন্য দেশে এসেছিলেন। তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আমি এ হত্যাকা-ের সুষ্ঠু বিচার চাই।

এ বিষয়ে নাঙ্গলকোট থানার ওসি আরিফুর রহমান বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও সেনাসদস্য মোতায়েন রয়েছে। এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ছররা গুলি ও কুপিয়ে ওই দুজনকে হত্যা করা হয়েছে। নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা যায়নি।

রূপগঞ্জে নিহত দুই : নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে মোবাইল চুরিকে কেন্দ্র করে আমেনা বেগম (৪৫) নামে এক গৃহবধূকে ছুরিকাঘাত করে হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ সময় অভিযুক্ত মেহেদী ইসলামকে (৩২) এলাকাবাসী আটক করে গণপিটুনি দিলে তার মৃত্যু হয়। গতকাল শুক্রবার বিকেলে উপজেলার কাঞ্চন পৌরসভার কেরাবো মোড় এলাকায় ঘটে এ ঘটনা।  নিহত গৃহবধূ আমেনা বেগম কেরাবো এলাকার বাবুল দেওয়ানের স্ত্রী। আর গণপিটুনিতে নিহত অভিযুক্ত মেহেদী ইসলাম টাইলস মিস্ত্রি এবং বিরাবো খালপাড় এলাকার মোস্তফা মিয়ার ছেলে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কেরাবো এলাকার মুদি মনোহরি ব্যবসায়ী বাবুল দেওয়ান নিজ বাড়িতে পাকা বিল্ডিং নির্মাণ করছিলেন। ওই বিল্ডিংয়ে টাইলস নির্মাণের কাজ দেওয়া হয় বিরাবো খালপাড়া এলাকার মেহেদী ইসলামকে। সেই থেকে আমেনাদের বাড়িতে মেহেদী আসা-যাওয়া করত।

গতকাল বিকেলে আমেনা বেগমের ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোন চুরি করে নিয়ে যাওয়ার পথে মেহেদীকে হাতেনাতে ধরে ফেলা হয়। এ সময় আমেনার কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে দস্তাদস্তি করতে থাকেন মেহেদী। একপর্যায়ে তার হাতে থাকা ধারালো ছুরি দিয়ে আমেনার গলায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম করেন। একপর্যায়ে আমেনা মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তার আত্মচিৎকারে স্থানীয় লোকজন এসে মেহেদীকে আটক করে ফেলে। পরে গণপিটুনি দিলে ঘটনাস্থলেই মেহেদী নিহত হন। এদিকে আমেনা বেগমকে মুমূর্ষু অবস্থায় স্থানীয় জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকেও মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনা কেন্দ্র করে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। ঘটনার সততা নিশ্চিত করে রূপগঞ্জ থানার ওসি বলেন, মোবাইল চুরির ঘটনা কেন্দ্র করে দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

দুর্বৃত্তদের গুলিতে টেকনাফে তরুণী নিহত : কক্সবাজারের টেকনাফে দুই অস্ত্রধারী গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলির সময় সুমাইয়া আক্তার (১৮) নামে এক তরুণী নিহত হয়েছেন। সুমাইয়া টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালীয়াপাড়ার এলাকার বাসিন্দা মো. ছিদ্দিকের মেয়ে। গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে টেকনাফের নোয়াখালীয়াপাড়ার পাহাড়ের পাদদেশে এ ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিশ্চিত করেন বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. ইলিয়াস। তিনি বলেন, মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যরা সাগরপথে মালয়েশিয়া পাঠানোর জন্য কিছু লোকজনকে ওই পাহাড়ে জড়ো করে রাখেন। এ সময় পাহাড়ে থাকা সন্ত্রাসীরা ওই স্থানের দিকে যেতে চাইলে মানব পাচারকারী চক্রের সঙ্গে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।

গোলাগুলির শব্দ শুনে পার্শ্ববর্তী ঘরের এক তরুণী কী হচ্ছে দেখতে চাইলে উভয়পক্ষের গোলাগুলির একটি গুলি এসে তার শরীরে লাগে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাটিতে লুটে পড়েন। পরে পরিবার ও স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে টেকনাফ হাসপাতালে নিয়ে আসে।

টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক নওশাদ আলম কানন বলেন, সন্ধ্যার পর কিছু লোকজন গুলিবিদ্ধ ১৮ বছর বয়সী এক তরুণীকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন, কিন্তু হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। তার শরীরে দুটি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে।

টেকনাফ মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, এক তরুণীর লাশ হাসপাতাল থেকে উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত