বাংলাদেশে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবু নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। বিশেষত জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এর ভবিষ্যৎ কিছুটা অনিশ্চিত। তবে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির পাশাপাশি, কয়লা থেকে সরে আসার পরিকল্পনা করছে এবং নতুন প্রকল্পগুলো পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে মনোযোগ দিচ্ছে। বিগত সরকারের সময় অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত খাত ছিল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি। সে সময় বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিপরীতে ব্যয় বেড়েছিল ১১ গুণ। তবে গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তন হলেও, এখন পর্যন্ত এই খাতের গুণগত মানোন্নয়নে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। সক্ষমতা থাকলেও, জ্বালানির অভাবে প্রায় সময়ই দেশের বিভিন্ন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ থাকে। কারিগরি ত্রুটির কারণে, অনেক কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা কমেছে। গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি, বড় পুকুরিয়ার বয়লারের পাইপ লিকেজের কারণে ৩ নম্বর ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। পরদিন ১৬ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় একই ত্রুটি দেখা দেয় ১ নম্বর ইউনিটে। সবশেষ ১৭ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ১ নম্বর ইউনিটও বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১ ও ৩ নম্বর ইউনিট বিকল হওয়ায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রম। তখন দিনাজপুর ও রংপুর অঞ্চলে দেখা দেয় লোডশেডিং। এরপর বিকল হওয়া ১ নম্বর ইউনিটে পাঁচ দিন পর ২২ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় (আংশিক) বিদ্যুৎ উৎপাদনের কার্যক্রম।
দিনাজপুরের পার্বতীপুরে অবস্থিত ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি ইউনিট দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে দ্বিতীয় ইউনিটে (১২৫ মেগাওয়াট) ২০২০ সাল থেকে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। আর তৃতীয় ইউনিট (২৭৫ মেগাওয়াট) গত বছর ৯ সেপ্টেম্বর থেকে বন্ধ হয়ে আছে। অবশ্য প্রথম ইউনিট (১২৫ মেগাওয়াট) ১৫ দিন বন্ধ থাকার পর গত ১৪ জানুয়ারি থেকে পুনরায় উৎপাদনে ফিরেছে। তবে এই ইউনিট থেকে মাত্র ৫০ থেকে ৫৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। ফলে কেন্দ্রটির মোট ৪০০ থেকে ৪৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি অব্যাহত রয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে উত্তরাঞ্চলসহ জাতীয় গ্রিডে। কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী বলছেন ‘চুক্তির সময়ের তুলনায় যন্ত্রাংশের দাম বেড়ে যাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামতে গড়িমসি করছে।’ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, ‘প্রথম ইউনিটটি বহুদিনের পুরনো। গত ৩০ ডিসেম্বর বয়লারের টিউব ফেটে যাওয়ায় এই ইউনিটের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। বহু কষ্টে ৪৮টি লিক ওয়েল্ডিং করে মেরামতের পর গত ১৪ জানুয়ারি রাত ১০টার পর এটি পুনরায় উৎপাদনে ফিরেছে।’ তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, ‘২৭৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন তৃতীয় ইউনিট ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে উৎপাদন শুরু করবে।’
২০৩০ সালের মধ্যে অনেক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ এবং নতুন কয়লা প্রকল্প বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কারণ, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অপরিহার্য হলেও, জলবায়ু পরিবর্তন ও জ্বালানি সংকটের কারণে এর ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জিং। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারিগরি নিয়ন্ত্রণে যারা আছেন, তারা অনেকটাই স্বাধীনভাবে কাজ করতে চাচ্ছেন। তবে বিষয়টিকে ‘স্বাধীনতা’ না বলে অজুহাত বলা ভালো। প্রকৃত অর্থে, কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিকল্প জনবান্ধব ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
