শীতের সবজিতে উৎপাদন খরচ কম ফলন বেশি

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:৪০ এএম

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় শীতকালীন সবজি চাষে ঘটেছে নীরব এক বিপ্লব। হালদা নদী ও এর উপশাখা নদী-খালের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল জুড়ে এখন সবুজের অপরূপ সমারোহ। শীতের শুরুতেই উর্বর পলিমাটিতে ফলন দিচ্ছে মুলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, শিম, বেগুন, লালশাক, পালংশাক, পুঁইশাক, বরবটি, ঢেঁড়স, শসা-খিরাসহ ১৫ থেকে ২০ প্রজাতির শীতকালীন সবজি।

পাহাড়ি ঢলে প্রতিবছর নতুন পলি জমায় এসব চরের মাটি প্রাকৃতিকভাবেই অত্যন্ত উর্বর হয়ে ওঠে। ফলে সার ও কীটনাশকের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে খুবই কম লাগে। এতে একদিকে উৎপাদন খরচ কমছে, অন্যদিকে ফলন হচ্ছে বেশি এবং সবজির স্বাদ ও গুণগতমান থাকছে অত্যন্ত উন্নত।

২০২৫-২৬ রবি মৌসুমে ফটিকছড়ি উপজেলায় শীতকালীন সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫ হাজার ১২৫ হেক্টর জমিতে। তবে কৃষকদের আগ্রহ ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে সেই লক্ষ্যমাত্রা ইতোমধ্যে ছাড়িয়ে গেছে। শুধু হালদা নদী ও এর উপশাখা খালের চরাঞ্চলেই আবাদ হয়েছে এক হাজার ৫০ হেক্টরেরও বেশি জমিতে। হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ধরা হয়েছে ১৪ মেট্রিক টন। সে হিসেবে মৌসুম শেষে মোট উৎপাদন দাঁড়াতে পারে প্রায় ৭১ হাজার ৭৫০ মেট্রিক টনের বেশি। বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এই মৌসুমে শীতকালীন সবজি থেকেই কৃষকদের মোট আয় প্রায় ১০৮ কোটি টাকায় পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পরিদর্শনে দেখা গেছে, হালদা নদীর দুই তীরসহ ভুজপুর, রোয়াঙ্গাঘোনা, নারায়ণহাট, ধুরুং, কাঞ্চননগর ও হারুয়ালছড়ি এলাকায় কৃষকরা পরিবার-পরিজন ও শ্রমিকদের নিয়ে জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ এবং পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। অনেক কৃষক ইতোমধ্যে আগাম জাতের সবজি তুলে বাজারজাত শুরু করেছেন। গত দুই সপ্তাহ ধরেই স্থানীয় বাজারে মুলা, লালশাক, পালংশাক, ফুলকপি ও বাঁধাকপিসহ বিভিন্ন সবজি বিক্রি হচ্ছে। ডিসেম্বর মাসে ১০ থেকে ১৫ প্রজাতির সবজি পুরোদমে বাজারে আসবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

পশ্চিম ভুজপুর এলাকার কৃষক মো. আব্দুল হক বলেন, ‘চরের মাটিতে চাষ করলে সার আর কীটনাশকের খরচ খুব কম লাগে। ফলন অন্য এলাকার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়। এখানকার সবজির চাহিদা চট্টগ্রাম শহর থেকে শুরু করে ঢাকা পর্যন্ত রয়েছে।’

ফটিকছড়ি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সালেক জানান, ‘হালদা ও পাহাড়ি খালের চরাঞ্চলের মাটি স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত উর্বর। পাশাপাশি সেচের পানির সুবিধাও সহজলভ্য। এ জন্য উৎপাদন ব্যয় কম এবং লাভ বেশি। আমরা কৃষকদের আধুনিক চাষপদ্ধতি, আগাম জাত নির্বাচন ও বাজার ব্যবস্থাপনা বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও মাঠ দিবসের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করছি। এর ফলেই প্রতি বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি উৎপাদন হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে প্রায় ১০৮ কোটি টাকার আয় হবে বলে আশা করছি।’

পারিবারিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত এসব সবজি এখন চট্টগ্রাম শহর ছাড়িয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহের পরিকল্পনা করছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। ফটিকছড়ির চরাঞ্চলের সবজি চাষ আজ শুধু স্থানীয় অর্থনীতির ভিত্তি নয়, বরং কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য সফল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত