অবৈধ ও থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে দ্রুত উদ্ধারের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। এ ছাড়া নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে সারা দেশের প্রায় ৪২ হাজার ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা এ নির্দেশনা দেন। বৈঠক শেষে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং আয়োজিত এক সংবাদ সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা আবার আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রসঙ্গ তোলেন। নির্বাচনের আগে অবৈধ ও লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেছেন, লুট করা অস্ত্র যে করেই হোক ইলেকশনের আগে যত দ্রুত পারা যায়, এগুলো উদ্ধার করতে হবে।
নিকারের বৈঠকে ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বলেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন এবং গণভোট উপলক্ষে সারা দেশের প্রায় ৪২ হাজার ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সরকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছে, ৬ হাজার ৫৫২টি কেন্দ্রে আগে থেকেই সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অতি গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ২১ হাজার ৯৪৬টি ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা বসাতে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এজন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ৭১ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এসব কেন্দ্রে প্রতিটিতে কমপক্ষে ছয়টি করে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হবে। বাকি কেন্দ্রগুলোয় স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে এবং তাদের অর্থায়নে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। এ কার্যক্রম ইতিমধ্যে সব জেলায় শুরু হয়েছে এবং তা জোরেশোরে চলছে। কয়েকটি জেলায় শতভাগের কাছাকাছি কেন্দ্রে ক্যামেরা বসানো হয়ে গেছে।
গাজীপুরের অগ্রগতির কথা তুলে ধরে উপ-প্রেস সচিব বলেন, সেখানে ৯৩৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৪৪৭টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে বিশেষ বরাদ্দের আওতায় অধিকাংশ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। বাকি কেন্দ্রগুলোয়ও ৩১ জানুয়ারির মধ্যে ক্যামেরা স্থাপন করা হবে।
তিনি আরও বলেন, সারা দেশে ২৯৯টি ভোটকেন্দ্রে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। এসব কেন্দ্রে সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনে জেনারেটরের মাধ্যমে ভোটের দিন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অভিযোগের প্রসঙ্গ ধরে এক প্রশ্নে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে প্রেস সচিব বলেন, নির্বাচন আয়োজনের জন্য কমিশনকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। একটি ‘সুষ্ঠু, অবাধ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর’ নির্বাচন আয়োজনই সরকারের দায়িত্ব।
নির্বাচন-সংক্রান্ত আরেক প্রশ্নে শফিকুল আলম বলেন, নির্বাচন নিয়ে কোনো ধরনের অনিশ্চয়তা নেই এবং নির্ধারিত সময়েই ভোট হবে। নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারি হবে, একদিন আগেও না, একদিন পরেও না এবং খুব সুন্দরভাবে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থান বিষয়ে গঠিত অধিদপ্তরকে ভূতাপেক্ষ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জননিরাপত্তা বিভাগ ও সুরক্ষা বিভাগ একীভূত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুনর্গঠনের বিষয়টিও ভূতাপেক্ষ অনুমোদন পেয়েছে।
প্রেস সচিব বলেন, বর্তমানে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপির অধীনে ৫০টি থানা রয়েছে, যা একটি ‘বিশাল কর্মযজ্ঞ’। এই কাঠামোকে আরও কার্যকর করতে ডিএমপিকে উত্তর ও দক্ষিণসহ একাধিক অংশে ভাগ করা যায় কি না সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে বৈঠকে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানের সময় হামলায় র্যাবের একজন কর্মকর্তা নিহত হওয়ার ঘটনায় বাহিনীর মনোবল ও নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর প্রভাব পড়বে কি না এমন প্রশ্নে প্রেস সচিব বলেন, ‘এটি আমাদের, এ বিষয়েও বৈঠকে আলাপ হয়েছে। এখানে জঙ্গল সলিমপুরে যে কাজটা হয়েছে, খুবই জঘন্য একটা কাজ এবং এটার আমরা নিন্দা জানাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ঘটনার পর ওই এলাকায় আরও জোরদারভাবে অভিযান চালানো হবে। সব বাহিনী একত্র হয়ে “কম্বাইন্ড অপারেশন” হবে। যারা এটার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, যত ক্ষমতাবানই হন না কেন, প্রত্যেককে গ্রেপ্তার করা হবে। এ ছাড়া ওই এলাকায় থাকা লুটের অস্ত্র উদ্ধারে “কম্বিং অপারেশনের” মাধ্যমে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।’
বাহিনীর সদস্যদের মনোবলের ওপর এ ঘটনার কোনো প্রভাব পড়বে কি না এমন প্রশ্নে প্রেস সচিব বলেন, ‘না, বরং আমি মনে করি, এটা তাদের সংকল্পকে আরও শক্তিশালী করবে।’
চারটি নতুন থানার অনুমোদন
প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে নিকারের ওই বৈঠকে দেশে চারটি নতুন থানা স্থাপনের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। সভায় প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত ১১টি প্রস্তাব অনুমোদিত হয়।
নতুন থানাগুলো হলো গাজীপুরের পূর্বাচল উত্তর, নারায়ণগঞ্জের পূর্বাচল দক্ষিণ ও কক্সবাজারের মাতারবাড়ী। এ ছাড়া নরসিংদীর রায়পুরাকে ভেঙে একটি নতুন থানা স্থাপনের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। আর সাতক্ষীরাকে ‘বি’ থেকে ‘এ’ শ্রেণির জেলায় উন্নীত করার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে।
সভায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ‘স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ’ এবং ‘স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ’ দুটিকে আবার একত্র করে ‘স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়’ পুনর্গঠন করার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।
এ ছাড়া মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়’ করার প্রস্তাব সভায় অনুমোদিত হয়। তবে এই মন্ত্রণালয়ের ইংরেজি নাম অপরিবর্তিত থাকবে।
সভায় পরিবেশগত বৈশ্বিক ঐতিহ্য, পর্যটন ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিবেচনায় সাতক্ষীরাকে ‘বি’ থেকে ‘এ’ শ্রেণিতে উন্নীত করার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। এ ছাড়া ঠাকুরগাঁওয়ে ‘ভূল্লী’ থানার নামের বানান সংশোধনের প্রস্তাব সভায় অনুমোদিত হয়।
সভায় প্রধান উপদেষ্টা ছাড়াও কয়েকজন উপদেষ্টা, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিবসহ সরকারের ১৪ জন সচিব বা জ্যেষ্ঠ সচিব উপস্থিত ছিলেন।
