দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বন্ধে প্রথমবার ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন ও রাশিয়া। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাই যুদ্ধরত দুপক্ষকে একইসঙ্গে আলোচনার টেবিলে নিয়ে এসেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে গত শুক্র ও শনিবার দুদিনব্যাপী এই আলোচনা থেকে অবশ্য কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। কোনো চুক্তি ছাড়াই শনিবার শেষ হয়েছে ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যকার দ্বিতীয় দিনের আলোচনা। আলোচনা শেষে দেওয়া বিবৃতিতে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর ইঙ্গিত পাওয়া না গেলেও মস্কো এবং কিয়েভ উভয় পক্ষই জানিয়েছে যে তারা পরবর্তী সংলাপের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী ১ ফেব্রুয়ারি আবুধাবিতে আবারও মস্কো ও কিয়েভের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন ওয়াশিংটনের প্রতিনিধিরা। আবুধাবির বৈঠক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেন, অনেক বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এ আলোচনা ছিল গঠনমূলক। জেলেনস্কি আরও বলেন, যুদ্ধ বন্ধের ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে, আলোচনায় সে কাঠামোর বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তোলা হয়েছে। তিনি বলেন, সম্ভাব্য পরবর্তী বৈঠকের আলোচনার বিষয়বস্তুর একটি তালিকা প্রস্তুত করেছেন সামরিক প্রতিনিধিরা।
এদিকে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ইউক্রেনের সঙ্গে আরও আলোচনার জন্য প্রস্তুত রয়েছে রাশিয়া। নাম না প্রকাশ করার শর্তে একটি সূত্র রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাসকে জানিয়েছে, আবুধাবির বৈঠকে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সূত্রটি বিস্তারিত কিছু বলেনি। ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের আয়োজক দেশে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের একজন মুখপাত্র বলেছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন শান্তি আলোচনা একটি ‘ইতিবাচক পরিবেশে’ সম্পন্ন হয়েছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবিত শান্তি প্রস্তাবের ‘অমীমাংসিত বিষয়গুলোর’ ওপর গুরুত্ব দিয়ে এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই বৈঠক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা বলেন, বৈঠকে উভয় পক্ষের মধ্যে আমরা যথেষ্ট শ্রদ্ধা ও সম্মানবোধ দেখেছি। কারণ, তারা সত্যিই একটি সমাধানের পথ খুঁজছিলেন। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আমরা বিষয়টির খুঁটিনাটি ও বিস্তারিত আলোচনা করেছি। আগামী রবিবার আরেকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে আমরা এই চুক্তির উদ্যোগকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব।
আগামী সপ্তাহের আবুধাবি আলোচনার পরবর্তী ধাপ বিবেচনা করে, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তার মস্কো বা কিয়েভে আরও আলোচনার আশা ব্যক্ত করেছেন। ওই কর্মকর্তা বলেন- আমাদের মতে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক, অথবা পুতিন, জেলেনস্কি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যে ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের আগে এই ধরনের আলোচনা হওয়া জরুরি। তবে আমার মনে হয় না যে আমরা সেই মুহূর্তটি থেকে খুব বেশি দূরে আছি।
পুরো দনবাস চায় রাশিয়া
শনিবারের আলোচনার পর জেলেনস্কি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল ‘যুদ্ধ শেষ করার শর্তাবলি নির্ধারণের সম্ভাব্য কাঠামো এবং এটি অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতি’র বিষয়টি উত্থাপন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তার মতে, প্রস্তাবিত নিরাপত্তা প্রোটোকলগুলো ‘অত্যন্ত শক্তিশালী’ হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত হয়েছে। তিনি বলেন, ইউক্রেনীয়রা এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর অনেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এই নিরাপত্তা প্রোটোকলগুলো পর্যালোচনা করেছেন। ন্যাটো প্রধান মার্ক রুটসহ প্রত্যেকেই একমত হয়েছেন যে, তারা এর আগে কখনো এত শক্তিশালী নিরাপত্তা প্রোটোকল দেখেননি। তবে আলোচনা শুরুর আগে শুক্রবার ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ইউক্রেনকে তার পূর্বাঞ্চলীয় দনবাস যা দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চল নিয়ে গঠিত শিল্পাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র সম্পূর্ণ ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে রাশিয়ার অবস্থান পরিবর্তন হয়নি।
দোনেৎস্কের যে ২০ শতাংশ এলাকা প্রায় পাঁচ হাজার বর্গ কিলোমিটার (এক হাজার ৯০০ বর্গমাইল) এখনো ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, পুতিন তা সমর্পণের দাবি তুলেছেন। এই দাবিটিই শান্তিচুক্তির পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ দেশ দোনেৎস্ককে ইউক্রেনের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও পুতিন দাবি করেন, দোনেৎস্ক রাশিয়ার ‘ঐতিহাসিক ভূখণ্ডের’ অংশ। চার বছরের দীর্ঘ ও ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে রাশিয়া যে অঞ্চলগুলো দখল করতে পারেনি, জেলেনস্কি তা ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। জনমত জরিপগুলো বলছে, ইউক্রেনীয়দের মধ্যে কোনো ধরনের ভূখণ্ডগত ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নেই বললেই চলে। রাশিয়া জানিয়েছে, তারা একটি কূটনৈতিক সমাধান চায়, তবে আলোচনা সফল না হওয়া পর্যন্ত সামরিক উপায়ে লক্ষ্য অর্জনের কাজ চালিয়ে যাবে। ইউক্রেনের জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের সচিব উমেরভ শুক্রবার গভীর রাতে জানান, প্রথম দিনের আলোচনায় যুদ্ধ শেষ করার মাপকাঠি এবং ‘আলোচনা প্রক্রিয়ার পরবর্তী যুক্তি’ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
আলোচনার মধ্যেই ইউক্রেনে হামলা
এই যুদ্ধ বন্ধে আবুধাবিতে যখন দ্বিতীয় দিনে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের প্রস্তুতি চলছিল, ঠিক তার আগেই ইউক্রেনে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করে রাশিয়া। ইউক্রেনের বিমান বাহিনী জানিয়েছে, রাশিয়া রাতভর ৩৭৫টি ড্রোন এবং ২১টি মিসাইল দিয়ে হামলা চালিয়েছে। এই হামলায় আবারও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যার ফলে রাজধানী কিয়েভের বড় একটি অংশ বিদ্যুৎ ও তাপহীন হয়ে পড়েছে। এতে অন্তত একজন নিহত এবং ৩০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। শনিবারের এই বোমাবর্ষণের আগে নতুন বছর শুরু হওয়ার পর থেকে কিয়েভ ইতিমধ্যে আরও দুটি বড় হামলার শিকার হয়েছে, যার ফলে শত শত আবাসিক ভবনে বিদ্যুৎ ও হিটিং সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ইউক্রেনের উপ-প্রধানমন্ত্রী শনিবার জানান, হাড় কাঁপানো শীতের মধ্যে রাশিয়ার রাতভর বিমান হামলায় ইউক্রেনের ১০ লাখের বেশি মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছেন।
রাজধানী কিয়েভ এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খারকিভে রাশিয়ার শত শত ড্রোন ও মিসাইল হামলার ঘটনাকে পুতিনের ‘নিষ্ঠুর’ বা ‘কপট’ আচরণ হিসেবে অভিহিত করেছেন ইউক্রেনীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন এই বর্বর হামলা আবারও প্রমাণ করে, পুতিনের স্থান (যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের) ‘শান্তি বোর্ডে’ নয়, বরং বিশেষ ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায়। তার মিসাইলগুলো শুধু আমাদের মানুষকে আঘাত করেনি, বরং আলোচনার টেবিলকেও আঘাত করেছে। জেলেনস্কি শনিবার বলেছেন, রাশিয়ার রাতভর এই ভয়াবহ হামলা প্রমাণ করে যে চলতি সপ্তাহে দাভোসে ট্রাম্পের সঙ্গে বিমান প্রতিরক্ষা সহায়তার বিষয়ে যে চুক্তিগুলো হয়েছে, তা ‘পুরোপুরি বাস্তবায়ন’ হওয়া অত্যন্ত জরুরি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ও ধ্বংসাত্মক এই সংঘাত বন্ধে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে এবং ছাড় দেওয়ার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিয়েভের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ বাড়ছে। চলতি সপ্তাহে দাভোসে অনুষ্ঠিত বার্ষিক ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে ট্রাম্পের শান্তিদূত স্টিভ উইটকফ বলেছেন, আলোচনায় অনেক অগ্রগতি হয়েছে এবং এখন কেবল একটি অমীমাংসিত বিষয় বাকি রয়েছে। তবে, রুশ কর্মকর্তারা এ ব্যাপারে আরও বেশি সংশয় প্রকাশ করেছেন।
