ক্ষমতায় গেলে কাউকে খাল বিল দখল করতে দেব না

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৩২ এএম

দেশের সব নদী, খাল-বিল রক্ষায় জনপ্রতিনিধিদের বছরে ৪ বার নদী ও খাল-বিলে গোসল করানো হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, কোনো মেয়র, এমপি, কমিশনার, চেয়ারম্যান বা মেম্বার ক্ষমতার প্রভাবে নদী, খাল-বিল দখল করতে পারবে না। ময়লার ভাগাড়ে পরিণত করতে পারবে না। যদি করে তাকে ময়লার ভাগাড়েই গোসল করতে হবে। গতকাল রবিবার রাজধানীর ঢাকা-৪, ঢাকা-৫ ও ঢাকা-৬ আসনে ১১ দলীয় জোট সমর্থিত পৃথক তিনটি নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সমাবেশগুলোতে জামায়াত আমির ঢাকা-৪ আসনের সৈয়দ জয়নুল আবেদীন, ঢাকা-৫ আসনের মো. কামাল হোসেন, ঢাকা-৬ আসনের ডা. আবদুল মান্নান, ঢাকা-৭ আসনের জামায়াত প্রার্থী হাফেজ হাজি মো. এনায়েত উল্লাহর হাতে দাঁড়িপাল্লা ও ঢাকা-৮ আসনের জোটের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর হাতে শাপলাকলি প্রতীক তুলে দেন। এ সময় তিনি দাঁড়িপাল্লা ও শাপলাকলির প্রার্থীদের বিজয়ী করার আহ্বান জানান। একইসঙ্গে জুলাই সনদের বাস্তবায়নের জন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ মানে আজাদি ‘না’ মানে গোলামি।

জামায়াত আমির বলেন, যাদের ৩৯ জন এমপি প্রার্থী ঋণখেলাপি (ব্যাংক ডাকাত) তারা দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে পারবে না। অন্তত ঐ দলের মুখে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার কথা মানায় না। চোর-ডাকাতদের সংসদে নিয়ে চোর-ডাকাত মুক্ত করা যায় না। দুর্নীতিবাজ আর চাঁদাবাজদের দিয়ে দুর্নীতি-চাঁদাবাজি বন্ধ করা যায় না। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের কবল থেকে জাতিকে মুক্ত করতে যাত্রাবাড়ী অঞ্চলের মানুষ সর্বোচ্চ ত্যাগ শিকার করেছে। এই অঞ্চল শহীদের রক্তে রঞ্জিত। এই অঞ্চলের দায় রাষ্ট্রকেই শোধ করতে হবে। আমাদের প্রার্থীরা আপনাদের সামনে নিজ-নিজ এলাকার যেই সমস্যাগুলো তুলে ধরেছে, জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে সব সমস্যার সমাধান করা হবে। জনপ্রতিনিধিদের শাসক নয় সেবক হতে হবে। জনগণের টাকায় দেশ চললে অবশ্যই জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে প্রতি ৬ মাস পরপর জনপ্রতিনিধিদের জনগণের মুখোমুখি হতে হবে। এ সময় জনগণের জন্য তারা কী কী কাজ করেছেন এবং পরবর্তী ৬ মাসে কী কী কাজ করবেন তার হিসাব জনগণকে দিতে হবে।

শফিকুর রহমান বলেন, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে প্রতিটি সরকার চরম অবহেলা করেছে। কওমি মাদ্রাসার সিনিয়র লেভেলের সনদের স্বীকৃতি দেওয়া হলেও নিচের দিকের কোনো সনদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে কওমি মাদ্রাসার সর্বস্তরের সনদের স্বীকৃতি দেওয়া হবে। যুবকদের বেকার ভাতা নয়, দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে গড়ে তোলা হবে। নারী সমাজের অধিকার, স্বাধীনতা, মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্রীয়ভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। মহিলাদের জন্য বড় শহরে সান্ধ্যাকালীন বাস সার্ভিস চালু করা হবে। আর চাঁদাবাজরা যদি তওবা করে সরল পথে ফিরে আসে তাদের জন্যও আমরা কর্মের ব্যবস্থা করব। আমিরে জামায়াত বলেন, আমরা সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বে বিশ্বাসী কিন্তু কাউকে আমাদের প্রভু হতে দেব না। কেউ যদি আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে চেষ্টা করে তবে তার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে। সমাজকে বদলে দিতে তিনি যুব সমাজকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আগামীর নেতৃত্ব দেবে তরুণ প্রজন্ম।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের জনগণ দীর্ঘ দিন ভোট দিতে পারেনি। বিশেষ করে তরুণ যুব সমাজ জীবনে একটিবারও ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায়নি। জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে আর কাউকে জনগণের ভোট নিয়ে ছিনিমিনি করতে দেওয়া হবে না। কেউ ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে কিংবা ভোট চুরির চেষ্টা করলে তাদের প্রতিহত করতে হবে। জনগণের বিজয় নিশ্চিত করতে জনগণকে সজাগ থাকতে তিনি আহ্বান জানান।

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ হবে, অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে, বাংলাদেশের মানুষ সুখে-শান্তিতে থাকবে। কিন্তু সেই লক্ষ্য আজও পূরণ হয়নি। দেশবাসী আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির শাসনব্যবস্থা দেখেছে। জুলাই আন্দোলন চলাকালে বিএনপির মহাসচিব বলেছেন, জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে তার দলের কোনো সম্পর্ক নেই! কারণ তারা আজকের পরিস্থিতি চায়নি, তারা চেয়েছে হাসিনা ক্ষমতায় থাকুক। এ সময় আরও বক্তব্য রাখেন,  জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইজহার, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমির আব্দুস সবুর, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা জহিরুল ইসলাম, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন, এবি পার্টির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক গাজী নাসির উদ্দিন, এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দিন মোহাম্মদ, জুলাই শহীদ জুনায়েদের পিতা শেখ জামাল হোসেন, ছাত্রশিবির সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, জকসু ভিপি রিয়াজুল ইসলাম, ওয়ারী পূর্ব থানা আমির মোতাসিম বিল্লাহ।

জামায়াত আমিরের সঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুক। গতকাল সকালে জামায়াত আমিরের কার্যালয়ে এ সাক্ষাৎ হয়। ব্রিটিশ হাইকমিশনার আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণভাবে আয়োজনের বিষয়ে যুক্তরাজ্যের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। ঢাকায় যুক্তরাজ্য হাইকমিশনের ভেরিফায়েড এক্সে এই তথ্য জানানো হয়। এ ছাড়া সকাল সাড়ে ৯টার দিকে এ বৈঠকের বিষয়ে জামায়াতের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। বৈঠকের সময় উপস্থিত ছিলেন ব্রিটিশ হাইকমিশনের উপহাইকমিশনার জেমস গোল্ডম্যান, রাজনীতি বিভাগের প্রধান টিমোথি ডাকেট ও দ্বিতীয় সচিব (রাজনীতি) কেট ওয়ার্ড। বৈঠকে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য অনুষ্ঠানের বিভিন্ন দিকসহ উভয় দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়।

আলোচনায় দুই পক্ষ আশা প্রকাশ করেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও শক্তিশালী হবে। এ ছাড়া উভয় দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ পারস্পরিক সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও গতিশীল হবে। আলোচনার সময় জামায়াতে ইসলামীর আমিরের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন, জামায়াতের আমিরের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা মাহমুদুল হাসান।

সন্ধ্যায় জামায়াত আমিরের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত মি. জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লেট এক সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন। তার সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি রাষ্ট্রদূত মি. ফ্রেদেরিক ইনজা ও অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মি. জুলিয়েন ডিউর। জামায়াতের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সাক্ষাৎকার দুটি অত্যন্ত আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্যভাবে অনুষ্ঠানের বিভিন্ন দিক এবং উভয় দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়। উভয়পক্ষ আশা প্রকাশ করেন, এ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও শক্তিশালী হবে। এ ছাড়া উভয় দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ পারস্পরিক সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও গতিশীল হবে বলে উভয়পক্ষ আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

আজকের কর্মসূচি : দলীয় সূত্র জানিয়েছে, জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান আজ সকাল ১০টায় কুষ্টিয়া যাবেন। তিনি দুপুর ১২টায় মেহেরপুরের জনসভায় বক্তব্য রাখবেন। বিকেল সাড়ে ৪টায় চুয়াডাঙ্গায় জনসভায় ও সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ঝিনাইদহে নির্বাচনী জনসভায় ভাষণ দেবেন। আগামীকাল (মঙ্গলবার) সকাল সাড়ে ৯টায় যশোরের জনসভায়, দুপুর সাড়ে ১২টায় সাতক্ষীরার জনসভায় বেলা সাড়ে ৩টায় খুলনায় ও সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় বাগেরহাটের জনসভায় ভাষণ দেবেন। পরদিন বুধবার জামায়াত আমির যাবেন জামালপুরে, সেখানে সকাল ১০টায় বক্তব্য রাখবেন জনসভায়। শেরপুরের জনসভায় বক্তব্য রাখবেন দুপুর ১২টায় এবং ময়মনসিংহে জনসভায় বক্তব্য রাখবেন বিকেলে সাড়ে ৪টায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত