মাদকের ভয়ংকর থাবা

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:২৮ এএম

‘মাদকাসক্তি’ শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ও আইনি অপরাধ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাদকের ব্যবহার, সংরক্ষণ, উৎপাদন ও বণ্টনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন রয়েছে। বাংলাদেশেও মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন রয়েছে। কিন্তু প্রয়োগ নেই বললেই চলে। দেশে মাদকের চাহিদা রয়েছে, তাই সরবরাহও আছে। সরবরাহ বন্ধ করা না গেলে, চাহিদা বাড়বেই। বাংলাদেশ এখন মাদকের আন্তর্জাতিক নিরাপদ রুট। বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারীরা বাংলাদেশকে ট্রানজিট দেশ হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশকে আবার মাদকের বড় বাজার হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক মাদক মাফিয়া চক্র। আফ্রিকা, মেক্সিকো, নাইজেরিয়া, ক্যামেরুন, ভারত, মিয়ানমার, মালাবি থেকে শুরু করে ইউরোপ ও আমেরিকার মাদক ব্যবসায়ীদের নজর এখন বাংলাদেশের দিকে। জানা যাচ্ছে, বর্তমানে দেশে আনুমানিক ৮২ লাখ মানুষ, কোনো না কোনো ধরনের অবৈধ মাদক ব্যবহার করছে। যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। মাদক অপব্যবহারকারী ব্যক্তিদের সংখ্যা, ধরন ও সংশ্লিষ্ট কারণ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। রবিবার বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের কনফারেন্স হলে গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানা যায়। 

সাধারণত কোনো দ্রব্য সহজলভ্য হলে, তা দ্রুত মানুষের হাতে চলে যায়। বর্তমানে  দেশে সহজলভ্য হয়ে উঠেছে মাদক। নানা কৌশলে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে প্রচুর মাদক ঢুকছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন হেরোইন, আফিম, প্যাথেডিন, ইয়াবা, আইস, গাঁজাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে ইয়াবা বেশ সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে এখন মাদকসেবীর সংখ্যা ৮২ লাখ। আর এখন মাদক হিসেবে ব্যবহারের শীর্ষে রয়েছে ইয়াবা নামের এক ধরনের উত্তেজক ট্যাবলেট। এছাড়াও হেরোইন, গাঁজা এবং ফেনসিডিলের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য।  জানা যাচ্ছে, ট্রানজিট দেশ হিসেবে বিমানবন্দর বা সীমান্তে যে পরিমাণ মাদকদ্রব্য ধরা পড়ে, তা বিক্রি হওয়া মাদকের মাত্র ১০ শতাংশ। আর ৯০ শতাংশ মাদকই ধরা পড়ে না। কিন্তু এই তথ্য কি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নেই! অবশ্যই রয়েছে। জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (ইউএনওডিসি)-র মতে, বাংলাদেশে বছরে শুধু ইয়াবা ট্যাবলেটই বিক্রি হচ্ছে ৪০ কোটির মতো, প্রতিটির দাম ২০০ টাকা হিসেবে যার বাজারমূল্য প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। এর মানে হচ্ছে, বিভিন্ন মাদক যোগ করলে টাকার পরিমাণ হবে কয়েক লাখ কোটি টাকা। সহজেই বোঝা যায়, এই বিশাল অঙ্কের অর্থবাজার নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন দেশের মাদক মাফিয়া যার কেশাগ্র স্পর্শ করার প্রায় অসম্ভব। যে কারণে শুধু শহরাঞ্চল নয়, গ্রাম এলাকায়ও পৌঁছে গেছে মাদক। আর ঢাকাসহ শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মাদকসেবী এবং ব্যবসায়ীদের বড়  কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

বিভিন্ন সময় মাদকবিরোধী অভিযানে, কয়েকজন মাদকসেবী এবং বিপুল পরিমাণে মাদক উদ্ধার করা হয়। ফলাও করে প্রকাশ-প্রচার হয় সেই খবর। এরপর আর কোনো তৎপরতা নেই। দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য আইন রয়েছে। এই আইনে মাদকদ্রব্যের উৎপাদন, বণ্টন, পরিবহন, সঞ্চয় ও ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর বিধানও আছে। কিন্তু কঠোর প্রয়োগ নেই। ফলে এর বাজার রমরমা। মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য কাজ করে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এর বাইরে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি এবং  কোস্টগার্ড মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করছে। যারা মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন বা মূল পাচারকারী, তারা গ্রেপ্তার হবেন দূরের কথা, মুখে নাম নেওয়াও মানা। দেশে অনলাইন বা অফলাইন মাদকের হাটবাজার রমরমা। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা বলা হলেও, বাস্তবে পৃষ্ঠপোষকদের গ্রেপ্তার প্রশ্নে রাষ্ট্রের ভূমিকা লক্ষ্য করা যায় না। শুধু বাহকদের গ্রেপ্তার করে লাভ হবে না, পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় এনে মুখোশ উন্মোচন করতে হবে। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে যা হওয়ার তাই হবে। সবকিছু চলবে মাদক মাফিয়ার ইচ্ছেমতো।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত