মার্কিন থানের দখলে পিভিসির বাজার

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:২৬ এএম

যুগ যুগ ধরে চলে আসা নির্বাচনী প্রচারে পোস্টার ব্যবহারের ঐতিহ্য এবার ভেঙেছে। এবারের ভোটের প্রচারে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এত দিনের প্রচলিত পোস্টার। পাশাপাশি নিষিদ্ধ করা হয়েছে পিভিসি (পলিভিনাইল ক্লোরাইড) ব্যানার। ফলে ছাপাখানাগুলোয় নেই নির্বাচনী আমেজ, তাদের ব্যবসায় নেমেছে ধস। অন্যদিকে কাগজের পোস্টার কিংবা পিভিসি ব্যানার-ফেস্টুনের বদলে প্রার্থীরা কাপড়ের ব্যানার-ফেস্টুন ব্যবহার করায় চাঙ্গা হয়ে উঠেছে পলিয়েস্টার ও মার্কিন কাপড়ের বাজার। কাপড়ের ব্যানার-ফেস্টুন তৈরির কারিগরদের ব্যস্ততাও বেড়েছে।

রাজধানীর প্রেসপাড়া-খ্যাত ফকিরাপুল, পুরান ঢাকার বাংলাবাজার, নয়াবাজার ও বাবুবাজার ঘুরে দেখা গেছে, কিছু দোকানে প্রার্থীদের সাদা-কালো হ্যান্ডবিল ও লিফলেট ছাপানো হচ্ছে। অন্য দোকানগুলোয় চলছে কোচিং সেন্টারের প্রচারপত্র, গাইড বই বা বিভিন্ন কোম্পানির ছাপার কাজ। ফকিরাপুল ও নীলক্ষেত এলাকায় প্রিন্টিং প্রেসগুলো কাপড়ের ব্যানার-ফেস্টুন তৈরিতে ব্যস্ত। এতে বেড়েছে সংশ্লিষ্ট কারিগরদের কাজের চাপ।

প্রেস মালিক ও কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাতীয় নির্বাচন ঘিরে প্রেসগুলোয় শতকোটি টাকার পোস্টার ছাপার ব্যবসা হতো। এবার তা পুরোপুরি বন্ধ। তবে লিফলেট ও হ্যান্ডবিল ছাপার কাজ করে অনেকে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন।

নীলক্ষেতের সব মার্কেট সাধারণত মঙ্গলবার বন্ধ থাকে। তবু অনেকে কাপড়ের প্ল্যাকার্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন তৈরি করছিলেন। বাকুশাহ মার্কেটের বিসমিল্লাহ বস্ত্রবিতানের মালিক মো. আবুল কাশেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনী প্রচার শুরুর পর থেকে ব্যানারের কাপড়ের চাহিদা বেড়েছে। কাঠের ফেস্টুনের জন্য পলিয়েস্টার কাপড়ের চাহিদা বেশি। বড় ব্যানারের জন্য মার্কিন কাপড়ের কদরও বেশি।’

মার্কিন কাপড়ের কদর বেশি হওয়ার কারণ জানতে চাইলে গাউছুল আজম মার্কেটের কারিগর মো. তানিম বলেন, ‘মার্কিন কাপড় মলিন হলে প্রিন্ট বা ব্লক-প্রিন্ট করা হলে সুন্দর দেখায়। এ কারণেই চাহিদা বেড়েছে।’

তিনি আরও জানান, প্রতি গজ মার্কিন কাপড়ের দাম ৭০-৯০ টাকা, পলিয়েস্টার কাপড়ের দাম ৪০ টাকা। প্রিন্টসহ ৩দ্ধ৯ ফুট একটি ব্যানার তৈরিতে খরচ হয় ১৬০ থেকে ২৩০ টাকা। পোস্টার সাইজের ফেস্টুন তৈরিতে খরচ ৩৫-৪০ টাকা।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারে লিফলেট, পোস্টার ও ব্যানার ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। পরিবেশের ক্ষতিকর উপাদান যেমন কাগজের পোস্টার, পিভিসি প্যানাফ্লেক্স, রেক্সিন, পলিথিন, প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ব্যানার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল ও ফেস্টুনেও নানা বিধিনিষেধ রয়েছে। একজন প্রার্থী তার আসনে সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন, যার কোনোটিই ১৬ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৯ ফুট প্রস্থের বেশি নয়। ব্যানার-লিফলেট-হ্যান্ডবিল-ফেস্টুন সাদা-কালো হতে হবে। ব্যানার সর্বোচ্চ ১০দ্ধ৪ ফুট, লিফলেট/হ্যান্ডবিল সর্বোচ্চ এ-৪ সাইজের এবং ফেস্টুন সর্বোচ্চ ১৮দ্ধ২৪ ইঞ্চি হতে পারবে।

নয়াবাজার প্রেস এলাকায় নাসির কাটিংয়ে বাগেরহাট-২ আসনের প্রার্থী এম এ এইচ সেলিমের লিফলেট কাটছিলেন আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন শুরুর আগে পোস্টার কাটিংয়ের স্তূপ পড়ে থাকত। এবার এক সপ্তাহ হয়ে গেল, বড় কাজ নেই। অল্প লিফলেটের কাজ পেয়েছি।’

কাটিং দোকানের মালিক নাসির হোসেন পোস্টার নিষিদ্ধে কিছুটা সন্তুষ্ট। তিনি বলেন, ‘পোস্টারের কারণে সব জায়গায় আবর্জনা হয়। এত পোস্টার লাগানো হয় যে কিছুই দেখা যায় না। পোস্টার না লাগালেও জনপ্রিয় প্রার্থীদের জনগণ চিনে নেয় এবং ভোট দেয়।’

ফকিরাপুলের ১নং গলির শেষপ্রান্তে ১১টি শিট মেশিনের বড় প্রেস চৌধুরী প্রেস অ্যান্ড বাইন্ডিং-এর মালিক রেজওয়ান খান। দাদার হাতে গড়া এ প্রেসে ৩৬ বছর ধরে মুদ্রণ ব্যবসা। তিনি বলেন, ‘প্রায় দুই হাজার প্রার্থী। প্রত্যেকে অন্তত এক লাখ পোস্টার ছাপতেন। প্রতি পোস্টার সর্বনিম্ন পাঁচ টাকা খরচ ধরলেও এ নির্বাচনে শতকোটি টাকার বেশি লেনদেন হতো। এবার সেই বড় বাজারে ধস নেমেছে।’

কাগজ আমদানিকারক ও জিনিয়া এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী নুরুল আফছার সেলিম বলেন, ‘পাকিস্তান আমল থেকে পোস্টারকেন্দ্রিক বড় ব্যবসা গড়ে উঠেছে। শিট মেশিনে কাজ করা লোকেরা মূলত পোস্টার-লিফলেটের কাজ করেন। এবার তারা বড় ধাক্কা খাবেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত