দেশে ফেরার ছক আওয়ামী লীগের

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪৫ এএম

বাংলাদেশে তাদের পরিচয়, তারা পলাতক অপরাধী, যাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ, হত্যা, রাষ্ট্রদ্রোহ কিংবা অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু কলকাতার শপিংমলের জনাকীর্ণ ফুডকোর্টে আরাম করে ব্ল্যাক কফি আর ভারতীয় ফাস্টফুড খেতে খেতে নির্বাসিত আওয়ামী লীগ নেতারা ব্যস্ত তাদের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনায়।

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের ৯ দিন বাকি থাকতে এক প্রতিবেদনে এমন চিত্র তুলে ধরেছে যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনের সার কথা হলো, কলকাতায় থাকা আওয়ামী লীগ নেতাদের বিশ্বাস, শেখ হাসিনা এখনো ‘নায়ক’ বেশেই দেশে ফিরতে পারবেন।

১৬ মাসের বেশি সময় আগে বাংলাদেশের কর্তৃত্ববাদী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এক অভ্যুত্থান তাকে নাটকীয়ভাবে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিক্ষোভকারীদের ওপর শেখ হাসিনার সরকারের দমন-পীড়নে আনুমানিক ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হয়েছিলেন। এরপর তার দলের হাজার হাজার সদস্যও পালিয়ে যান। আওয়ামী লীগের ছয়শর বেশি নেতাকর্মী বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ভারতের শহর কলকাতায় আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের দলীয় কর্মকা- ও সংগঠনকে চালিয়ে নিতে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন হয়ে উঠেছে।

গত বছরের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার জনমতের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে আওয়ামী লীগের সব ধরনের কর্মকা- নিষিদ্ধ করে। এরপর দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন। একই সঙ্গে হত্যা, দুর্নীতিসহ নানা অপরাধের ঘটনায় দলটির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার শুরু করে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত বছরের শেষের দিকে হাসিনাকে তার শাসনামলের শেষ পর্যায়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদ- দেয়।

হাসিনার পতনের পর প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠেয় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনেও দলটির প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তিনি এই রায়কে ‘মিথ্যা’ বলে নাকচ করেছেন এবং অসংকোচে ভারত থেকে তার প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা করছেন, যার মধ্যে আসন্ন নির্বাচনে বিঘœ ঘটাতে হাজার হাজার সমর্থককে সংগঠিত করার বিষয়ও রয়েছে।

ভারতের রাজধানী দিল্লির এক সুরক্ষিত ও গোপন আস্তানা থেকে হাসিনা দিনের বড় একটা সময় বাংলাদেশে থাকা তার কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে দলীয় সভা ও ফোনালাপে ব্যয় করেন। তার রাজনৈতিক কর্মকা-গুলো পরিচালিত হয় ভারত সরকারের সতর্ক নজরদারিতে। তাকে প্রত্যর্পণের জন্য বাংলাদেশের অনুরোধও এড়িয়ে গেছে দেশটি।

আওয়ামী লীগের শাসনামলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সে বিষয়ে কলকাতায় আরামদায়ক বাসভবনে থাকা দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে প্রায় কোনো অনুশোচনা বা অনুতাপ দেখা যায়নি। অধিকাংশ নেতাই তাদের ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা আন্দোলনকে একটি জনগণের বিদ্রোহ হিসেবে মেনে নিতে রাজি নন।

দলীয় কৌশল নিয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনার জন্য গত এক বছরে সাবেক সংসদ সদস্য, মন্ত্রিসভার সদস্যসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়মিত কলকাতা থেকে দিল্লিতে ডেকে পাঠানো হয়েছে। আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) সভাপতি সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে আমাদের লোকজনের সঙ্গে আমাদের কর্মী-সমর্থক, দলের নেতা, তৃণমূল পর্যায়ের নেতা এবং অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। ভবিষ্যতের সংগ্রামের জন্য তিনি দলকে প্রস্তুত করার চেষ্টা করছেন।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের নেত্রী খুবই আশাবাদী, তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন। আমরা বিশ্বাস করি, শেখ হাসিনা বীরের বেশে ফিরবেন।’

শেখ হাসিনার সাবেক মন্ত্রীদের একজন জাহাঙ্গীর কবির নানক। তিনি বলেন, দলের কর্মীদের সব ধরনের নির্বাচনকেন্দ্রিক সংশ্লিষ্টতা থেকে দূরে থাকতে, প্রচার ও ভোট বর্জন করতে এবং মোটের ওপর এই প্রহসনের প্রক্রিয়ার অংশ না হতে বলা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের যারা অতীতের ‘ভুল’ স্বীকার করছেন, হাতেগোনা সেই ব্যক্তিদের একজন সাবেক সংসদ সদস্য তানভীর শাকিল জয়।  তিনি বলেন, ভারতে তার (হাসিনা) এই নির্বাসন দীর্ঘস্থায়ী হবে না। যদিও তিনি মেনে নিয়েছেন, শেষমেশ দেশে ফিরলে তার জন্য হয়তো কারাগারই অপেক্ষা করছে। তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের জন্য সবকিছু খুব খারাপ। কিন্তু মনে করি না যে বেশি দিন এমন থাকবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত