নতুন ভোরের অপেক্ষায় 

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:০৩ এএম

রাজনীতির ইতিহাসে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এক অবিস্মরণীয় দিন হতে যাচ্ছে। মাত্র ৫ দিন পরেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এটিই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা নির্ধারণ করবে। গত ১৭ বছর পর এই প্রথম  ভোটাররা শ্বাসরুদ্ধকর ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে  দেশের রাজনীতি শাসন করা প্রধান দুই দলের নারী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ অনুপস্থিতি। প্রথম জন প্রয়াত, অন্যজন আন্দোলনের তোড়ে ভিন দেশে নির্বাসিত। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে স্থগিত থাকায় ব্যালট পেপারে ‘নৌকা’ প্রতীক থাকছে না। ফলে দেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ এখন সম্পূর্ণ নতুন মোড় নিয়েছে, যেখানে মূলত লড়াই হচ্ছে জাতীয়তাবাদী ও ইসলামপন্থি রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে। বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচনী ময়দানে প্রধানত দুটি জোটের শক্তি প্রদর্শন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একপক্ষে রয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং অন্যপক্ষে ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) সমন্বয়ে গঠিত ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য। দেশের ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন ভোটারের বিশাল একটি অংশ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, যারা এর আগে কখনো অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি, তারাই ভোটের মূল নিয়ামক হয়ে উঠেছেন। এই ভোটারদের সংখ্যা এবার কয়েক কোটি। যারা দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার স্বপ্ন দেখছেন। এবারের নির্বাচনে ৫৯.৫ শতাংশ জনসমর্থন নিয়ে ‘জুলাই সনদের’ অনুকূলে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে একই দিন। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোট গ্রহণ হবে এবং প্রায় ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থী চূড়ান্ত লড়াইয়ে রয়েছেন। ডাকযোগের মাধ্যমে ভোট এবং ‘না ভোট’ চালুর মাধ্যমে নির্বাচনী ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা হয়েছে।

আজসহ ভোটের ৫ দিন বাকি থাকতে দেশ জুড়ে উত্তাপের পাশাপাশি এক ধরনের উদ্বেগও বিরাজ করছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের মধ্যে ছোটখাটো সংঘর্ষ এবং ১৬৫টিরও বেশি সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। বিশেষ করে, শেরপুরে জামায়াত নেতার হত্যাকাণ্ড এবং গত কয়েক সপ্তাহে ১৫টি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে শঙ্কার সৃষ্টি করেছে। সেনাপ্রধানের ঘোষণা অনুযায়ী, নির্বাচনের দিন সারা দেশে প্রায় ১ লাখ সেনা সদস্য মোতায়েন থাকবে, যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা না ঘটে। রাজনৈতিক দলগুলোর হাবভাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিএনপি তাদের হারানো ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে মরিয়া এবং তারা তরুণ ভোটারদের টানতে ‘জনতার সংযোগ’-এর মতো আধুনিক প্রচার কৌশলে গুরুত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী গত তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে ফিরে আসার চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকদের মতে, তারা এবার চমক দেখাতে পারে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বামপন্থি দলগুলো তেমন প্রভাব ফেলতে না পারায়, রাজনীতির পাল্লা অনেকটাই ডানে হেলেছে। নির্বাচন কমিশন এবং অন্তর্র্বর্তী সরকার একটি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরির দাবি করলেও, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা নির্বাচন-পরবর্তী স্থিতিশীলতা নিয়ে সন্দিহান। সব মিলিয়ে, আগামী পাঁচ দিন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত সংকটময় ও উত্তেজনাপূর্ণ। এই নির্বাচনের ফলই বলে দেবে, বাংলাদেশ কি একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরবে, নাকি কোনো রাজনৈতিক সংকটের জালে জড়াবে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোটারদের জন্য এবার দুটি ব্যালট পেপার থাকবে একটি সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য (সাদা ব্যালট) এবং অন্যটি সংবিধান সংস্কার ও জুলাই সনদের ওপর গণভোটের জন্য (গোলাপি ব্যালট)। এই দ্বিমুখী ভোট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট একদিকে যেমন নতুন সরকার গঠন করবে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের বৈধতাও নিশ্চিত করবে। বিশেষ করে প্রবাসীদের জন্য ডিজিটাল পোস্টাল ব্যালটিং সিস্টেমের প্রবর্তন দেশের ইতিহাসে প্রথম, যেখানে বিশ্বের ১২২টি দেশ থেকে প্রায় ৭ লাখ ৬৭ হাজার বাংলাদেশি তাদের নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। সবচেয়ে বেশি রেজিস্ট্রেশন হয়েছে সৌদি আরব থেকে, যা প্রবাসীদের জাতীয় রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার তীব্র আকাক্সক্ষাকেই প্রমাণ করে।

মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক চিত্র বলছে, বিএনপি এবার অত্যন্ত সতর্ক কৌশলে এগোচ্ছে। বিএনপি সমর্থকরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগের অবর্তমানে তাদের বিজয় কেবল সময়ের ব্যাপার। তবে তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর ক্রমবর্ধমান প্রভাব। জামায়াত ও তাদের ১১ দলীয় জোট প্রতিটি গ্রামগঞ্জে তাদের নেটওয়ার্ক সক্রিয় করেছে এবং তারা এবার ‘ক্লিন ইমেজ’ ও ইসলামি মূল্যবোধকে পুঁজি করে ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে জামায়াত এবার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য আলাদা সেল গঠন করে, তাদের ভীতি দূর করার পদক্ষেপ নিয়েছে।  নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং জুলাই বিপ্লবের ছাত্রনেতারা এবারের নির্বাচনে ‘এক্স ফ্যাক্টর’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। নাহিদ ইসলাম ও আখতার হোসেনের মতো তরুণ নেতারা রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার যে স্লোগান দিয়েছেন, তা শহুরে তরুণ ও প্রথম ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। যদিও তাদের নিজস্ব ক্যাডারভিত্তি বড় দলগুলোর মতো শক্তিশালী নয়, তবুও তাদের আদর্শিক অবস্থান এবং সংস্কারের অঙ্গীকার ভোটারদের বড় অংশকে প্রভাবিত করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপি এবং জামায়াতের মধ্যে যে কৌশলগত ঐক্য বা বোঝাপড়া গড়ে উঠেছে, তা বিএনপির জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে। নির্বাচনী ডামাডোলের মাঝেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের অভিযোগ। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও এলাকায় চাঁদাবাজির যে অভিযোগ উঠেছিল, তা দলের ভাবমূর্তিতে কিছুটা আঘাত হেনেছে। জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় এই বিষয়টিকে বারবার সামনে আনছে, যাতে নিরপেক্ষ ভোটারদের বিএনপির প্রতি বিমুখ করা যায়। এই অভ্যন্তরীণ কাদা ছোড়াছুড়ি নির্বাচনী পরিবেশকে কিছুটা তিক্ত করে তুলছে, যদিও বড় সব দলই ‘ঐক্য’ এবং ‘জাতীয় স্বার্থের’ কথা বলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রস্তুতি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে ১ হাজার ৫০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করবেন। পুলিশ, বিজিবি এবং আনসারের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর বিশেষ টহল দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে চেকপোস্ট বসিয়েছে। বিশেষ করে ভারতের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কারণ সম্প্রতি ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপড়েন এবং সীমান্ত উত্তাপ সাধারণ মানুষের মধ্যে নির্বাচনের সময় বহিঃশক্তির প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। দেশের মানুষ আশাবাদী যে, নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া পাহারায় অন্তত ভোটকেন্দ্র দখল বা ব্যালট ছিনতাইয়ের মতো পুরনো সংস্কৃতি এবার দেখা যাবে না।

নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ নিশ্চিত করেছেন যে, আজ ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই দেশের ২৯৯টি নির্বাচনী এলাকায় ব্যালট পেপার পৌঁছে যাবে। কিছু জায়গায় প্রার্থিতা নিয়ে আইনি জটিলতার কারণে ব্যালট পুনরায় ছাপাতে হয়েছে, যা শেষ মুহূর্তে কমিশনের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। তবে কমিশন দাবি করছে, এবার স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স এবং আধুনিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ভোটের ফলাফলে কারচুপির সুযোগ নেই। এমনকি প্রতিটি কেন্দ্রে ভোটের পর প্রিসাইডিং অফিসারদের ফলাফল সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটালি প্রেরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গণভোটের বিষয়টি এবারের নির্বাচনে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। ‘জুলাই সনদ’ অনুযায়ী সংবিধানে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ এবং দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী না থাকার যে প্রস্তাবনা রয়েছে, তার ওপর দেশের মানুষ সরাসরি মতামত দেবেন। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, সাধারণ নির্বাচনের চেয়েও এই গণভোটের গুরুত্ব দীর্ঘমেয়াদে বেশি। কারণ এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবে। ফলে ভোটারদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য রেডিও-টেলিভিশনে ব্যাপক প্রচার চলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান। পশ্চিমী দেশগুলো, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই নির্বাচনকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তাদের লক্ষ্য একটি অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচন, যেখানে জনগণের প্রকৃত রায়ের প্রতিফলন ঘটবে। অন্যদিকে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের যে শীতলতা  তৈরি হয়েছে, নির্বাচনের ফলাফল সেই সম্পর্কে নতুন মোড় নির্ধারণ করতে পারে। বিএনপি এবং জামায়াত উভয়েই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ‘সমমর্যাদার ভিত্তিতে’ সম্পর্কের কথা বললেও, জনমনে ভারতের প্রভাব নিয়ে এক ধরনের স্পর্শকাতরতা রয়েছে।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবারের নির্বাচনের বড় ইস্যু। মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং সিন্ডিকেট দমনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতিটি দলই তাদের ইশতেহার সাজিয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থান এবং  বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর কার্যকর কোনো রোডম্যাপ কোন দল দিতে পারবে, সেদিকেই তাকিয়ে আছে মধ্যবিত্ত সমাজ। অন্তর্র্বর্তী সরকার বেশ কিছু ব্যাংক সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকার সেই ধারা বজায় রাখবে কিনা, তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে শঙ্কা ও সম্ভাবনা উভয়ই কাজ করছে। সুতরাং, ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট কেবল একদলকে সরিয়ে আরেক দলকে ক্ষমতায় বসানোর নির্বাচন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের মানুষের আত্মপরিচয় এবং গণতান্ত্রিক স্বাধিকারের লড়াই। ১২ তারিখে ভোটের যে চূড়ান্ত রায় আসবে, তা হয়তো পরবর্তী কয়েক দশকের জন্য বাংলাদেশের রাজনীতি ও উন্নয়নের গতিপথ নির্ধারণ করবে। দেশের মানুষ গভীর আগ্রহ ও খানিকটা উদ্বেগ নিয়ে অপেক্ষা করছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য, যেখানে ভোটকেন্দ্রে ব্যালট যুদ্ধের মাধ্যমে জয়-পরাজয় নিশ্চিত হবে। এটি কেবল ভোট নয়, একটি নতুন ভোরের অপেক্ষা। 

লেখক: সিইও, ইটিসি ইভেন্টস লিমিটেড

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত