যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দুই বছরের দীর্ঘ সংঘাতে পর ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় যুদ্ধ থামলেও, ইসরায়েলের আগ্রাসন বন্ধ হয়নি। শান্তিচুক্তি লঙ্ঘন করে গাজায় হামলা চালিয়ে ৫৫০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। এর মধ্যেই এবার অধিকৃত পশ্চিম তীরে নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করতে চায় তেল আবিব। গত রবিবার ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা যে সিদ্ধান্তগুলো অনুমোদন করেছে, সেগুলোর মাধ্যমে তারা পশ্চিম তীরে নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়াতে চায়। এই এলাকাগুলোই ভবিষ্যতে ফিলিস্তিনিদের সম্ভাব্য রাষ্ট্রের অংশ হবে বলে তারা আশা করে। তবে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক দখলদারিত্ব ও সম্প্রসারণবাদী তৎপরতায় আপত্তি জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম এক্সিওস। হোয়াইট হাউজের দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্টভাবে বলেছেন, তিনি পশ্চিম তীর ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করার পক্ষে নন। সেখানে আরও বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মনে করেন, একটি স্থিতিশীল পশ্চিম তীর ইসরায়েলকে নিরাপদ রাখবে; আর তাছাড়া তিনি এবং তার নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি স্থাপন।
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে পশ্চিম তীর এলাকায় দখলদারিত্ব ও সম্প্রসারণমূলক তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েল। গত প্রায় আড়াই বছরে পশ্চিম তীরের বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার নতুন আবাসন গঠনের পরিকল্পনা পাস করেছে ইসরায়েলের মন্ত্রিসভা। সেসব প্রকল্পের মধ্যে কয়েকটির কাজ ইতিমধ্যে শুরুও হয়ে গেছে। ইসরায়েলের নতুন পদক্ষেপের ফলে পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি গড়তে ইসরায়েলিদের জন্য জমি পাওয়া আগের চেয়ে সহজ হবে। যদিও আন্তর্জাতিক আইনে এসব বসতি অবৈধ বলে বিবেচিত। ইসরায়েলের ওই ঘোষণা বিশ্বজুড়ে সমালোচিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলে তৈরি হয়েছে ব্যাপক ক্ষোভ। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আট দেশ গতকাল এক যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েলের এমন পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে। তাদের মতে, ইসরায়েলের এসব অবৈধ সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বেআইনিভাবে দেশটির কর্র্তৃত্ব চাপিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। এই আটটি দেশ হলো মিসর, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। উল্লেখ্য, এই আটটি দেশই ট্রাম্পের প্রতিষ্ঠিত গাজা বোর্ড অব পিসের সদস্য। আট দেশ বিবৃতি দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর এ ইস্যুতে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন ট্রাম্প। যৌথ বিবৃতিতে এসব দেশ বলেছে, ইসরায়েলের পদক্ষেপের লক্ষ্য, অবৈধ বসতি স্থাপন কার্যক্রম আরও পাকাপোক্ত করা। পশ্চিম তীরে নতুন আইনি ও প্রশাসনিক বাস্তবতা চাপিয়ে দেওয়া। ইসরায়েলি পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে অবৈধভাবে পশ্চিম তীর দখলের চেষ্টা আরও বেগবান করা এবং সেই সঙ্গে ফিলিস্তিনের জনগণকে তাদের ভূমি থেকে উৎখাতের পথ তৈরি করা হচ্ছে বলেও যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসরায়েলের এমন পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। সমালোচনা করেছে যুক্তরাজ্য ও স্পেন। জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক বলেন, ইসরায়েলের পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করছে এবং ‘দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক’ সমাধানের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে মনে করছেন মহাসচিব।
মাহমুদ আব্বাসের সতর্কবার্তা : ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর অঞ্চলে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক তৎপরতা দ্বিরাষ্ট্র সমাধানকে হুমকির মুখে ফেলছে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। গত সোমবার জর্ডানের রাজধানী আম্মানে এক সংবাদ সম্মেলনে এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন তিনি। জর্ডানের রাজা দ্বিতীয় আবদুল্লাহর সঙ্গে বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মাহমুদ আব্বাস বলেন, আন্তর্জাতিক আইন এবং বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত সিদ্ধান্ত দ্বিরাষ্ট্র সমাধানকে পুরোপুরি পাশ কাটিয়ে পশ্চিম তীর অঞ্চলে নিজেদের দখলদারিত্ব কার্যক্রম বাড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েল। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিনের আত্মপ্রকাশের সম্ভাবনাকে চিরতরে নস্যাৎ করাই ইসরায়েলের উদ্দেশ্য। তিনি আরও বলেন, এটি শুধু দ্বিরাষ্ট্র সমাধানকেই হুমকির মুখে ফেলছে না, বরং একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে ইসরায়েলকে থামাতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ কামনা করে প্রেসিডেন্ট আব্বাস বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনের অন্তর্ভুক্ত ভূখণ্ডে যাবতীয় দখলদারিত্ব কার্যক্রম স্থগিত রাখার বিষয়টি উল্লেখ ছিল। আমি তাকে সেই বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই এবং ফিলিস্তিনের অস্তিত্বের স্বার্থে এ ইস্যুতে তার হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
