ভোট আসে, নেতা পাল্টায়, প্রতিশ্রুতি আসে বন্যার মতো; কিন্তু পাল্টায় না হরিরামপুর উপজেলার পদ্মাবেষ্টিত চরাঞ্চলবাসীর ভাগ্য। একের পর এক সংসদ নির্বাচন হলেও নদীভাঙনের সঙ্গে লড়াই করা এ অঞ্চলের মানুষের জীবনে টেকসই কোনো পরিবর্তন আসেনি। নির্বাচনের মঞ্চে প্রতিশ্রুতির ছড়াছড়ি আর ভোটের পর বাস্তবতা-ভাঙন, অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগের ঘূর্ণিপাকে আটকে পড়া।
হরিরামপুর উপজেলা ১৩টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ৪১ হাজার ৬০৮ জন, যার মধ্যে চরাঞ্চলের সর্বাধিক অবহেলিত তিন ইউনিয়ন-লেছড়াগঞ্জ, আজিমনগর ও সুতালড়ি এই তিন ইউনিয়নে ভোটার প্রায় ১৯ হাজার ৪০০। ১৩টি ইউনিয়নের আয়তন প্রায় ৫৭৫ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার। এর মধ্যে অবহেলিত চরাঞ্চলের ওই তিন ইউনিয়নের আয়তন প্রায় ৩৬ দশমিক ৩ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার। পদ্মার গতিপথ পরিবর্তন ও তীব্রভাঙনের কারণে প্রতিবছর এই তিন ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীতে বিলীন হচ্ছে, যার ফলে হাজার হাজার মানুষ বারবার আশ্রয় বদলাতে বাধ্য হন।
এসব চরাঞ্চলে প্রবেশের একমাত্র উপায় নদীপথ। যোগাযোগ ব্যবস্থায় যাত্রী এবং মালামাল বহনে এখনো তাদের ভরসা ঘোড়া অথবা গরুর গাড়ি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়ে থাকে ভ্যানগাড়ি। ইউনিয়ন তিনটিতে মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ, শিক্ষা, যোগাযোগ এবং চিকিৎসাব্যবস্থার চরম দৈন্যদশা। সবচেয়ে গুরুতর দুর্ভোগের বিষয় হলো চিকিৎসা। রোগীদের ভালো কোনো চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। হাসপাতালে যেতে হলে পদ্মা নদী পাড়ি দিতে হয়, যা বেশ অসুবিধাজনক। রাত হলে চিকিৎসা নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। ফলে অনেককে বিনাচিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করতে হয়।
চরবাসীর অভিযোগ, নদীভাঙন প্রতিরোধে অস্থায়ী ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি। ভোটের সময় প্রার্থীরা নদীভাঙন রোধ, সড়ক-সংযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু বাস্তবে স্থায়ী কোনো সমাধান দেখা যায় না।
লেছড়াগঞ্জের আরজিনা বেগম বলেন, ‘ভোটের সময় সবাই আসে, আমাদের কষ্ট শুনে যায়। ভোট শেষ হলে আর কেউ খোঁজ নেয় না। ঘর বানাই, নদী আবার নিয়ে যায় এভাবেই জীবন কাটছে।’
আজিমনগরের বেলায়েত আলী বলেন, ‘বাপ-দাদার রেখে যাওয়া প্রায় ২০ বিঘা জমি পদ্মায় চলে গেছে। ভোট আসে, নেতা বদলায়, কিন্তু আমাদের দুঃখ ঘোচে না।’
সুতালড়ি ইউনিয়নের যুবক শাকিল গাজী বলেন, ‘প্রতিটি নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি থাকে, কিন্তু বাস্তবে কোনো কাজ দেখি না।’ স্থানীয়রা এবার নতুন প্রতিশ্রুতি চান না। তারা চান টেকসই বেড়িবাঁধ, স্থায়ী নদীশাসন, নিরাপদ সড়ক ও নৌ-যোগাযোগ, পরিকল্পিত পুনর্বাসন এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ মৌলিক সেবার নিশ্চয়তা। এসব বাস্তবায়ন না হলে নির্বাচন আসবে, নেতা পাল্টাবে; কিন্তু হরিরামপুরের চরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য বদলাবে না।
