ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল থেকে শুরু করে প্রচারের শেষ সময় পর্যন্ত ৫৪৫ অপতথ্য শনাক্তের তথ্য জানিয়েছে রিউমার স্ক্যানার বাংলাদেশ। এসব অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে ফেসবুক এবং ইউটিউব ব্যবহার করে। এসব অপতথ্যের শিকার হয়েছেন অন্তত ৫১ জন সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী। যার মধ্যে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান, নারীদের মধ্যে তাসনিম জারা, রুমিন ফারহানা সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন। এই সময়ে যে শুধু প্রার্থীদের অপপ্রচারের লক্ষ্য বানানো হয়েছে তাই নয়, প্রধান উপদেষ্টাও এর বাইরে ছিলেন না। এ তালিকার বাইরে ছিল না পুলিশ এবং সেনাবাহিনীও।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত অপতথ্য ছড়িয়ে নির্দিষ্ট কোনো প্রার্থী বা দলকে হেয় করাই ছিল এসব পোস্টের কারণ। যাতে করে বিদ্বেষ ছড়িয়ে নির্দিষ্ট প্রার্থীর ভোট কমানো যায়। তবে এর প্রভাব ঠিক কতটা পড়বে তা আজকের নির্বাচনই বলে দেবে। যদিও অনেকে মনে করেন, সাধারণ মানুষ যারা বুঝতে পারেন না এসব অপতথ্য তারা অনেক ক্ষেত্রে এগুলো বিশ^াস করে নিজের সিদ্ধান্ত বদলেও ফেলতে পারেন। যা আসলে ভোটের হিসাব-নিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একেকটি আসনে নির্দিষ্ট দলের বা মতের বাইরেও ভোটার রয়েছেন। তাদের প্রভাবিত করতেই এসব অপপ্রচার চালানো হয়েছে। কারণ সাধারণ মানুষ এখন অনেক বেশি সামাজিক মাধ্যমের খবর দেখে থাকেন।
রিউমার স্ক্যানারের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এআই-ডিপফেক, ফটোকার্ড, ভুয়া ও সম্পাদিত বক্তব্য বেশি ব্যবহার করা হয়েছে অপতথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রে। বিশেষ করে গণমাধ্যমের নাম ব্যবহার করে একেকটি ফটোকার্ডে বক্তব্য পাল্টে প্রচার করা হয়েছে।
রিউমার স্ক্যানারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবার ৪৭টি সংসদীয় আসনে অপতথ্যের প্রবাহ ছিল সবচেয়ে বেশি। এসব আসনে মোট ১২৯টি অপতথ্য ছড়িয়েছে। আসনভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে ঢাকা-৮ আসনে। যেখানে মোট ৫১টি অপতথ্য পাওয়া গেছে। এই আসনটি দুজন প্রার্থীর কারণে এমনিতেই আলোচনায় রয়েছে। এখানে বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাস এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী তরুণ রাজনীতিবিদ নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
সম্প্রতি কালবেলার এক ফটোকার্ড নকল করে জামায়াতের আমিরের ছবি এবং নাম ব্যবহার করে লিখা হয়েছেÑ ভোট ডাকাতি করে হলেও আমরা ক্ষমতায় যেতে চাই। বাস্তবে দেখা গেছে, এ ধরনের কোনো ফটোকার্ড কালবেলা ব্যবহার করেনি।
একইভাবে দেশটিভির একটি ফটোকার্ড নকল করে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চরের মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহর নামে ভুয়া ফটোকার্ড ছড়ানো হয়। যেখানে লিখা ছিল- ‘দুর্নীতি করে মুচলেকা দিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছি, এখন আবার ভারতের কাছে মুচলেকা দিয়ে দেশে এসে মানুষকে বলে গুপ্ত, মানুষ এখনো আপনার দুর্নীতি ও হাওয়া ভবনের ইতিহাস ভুলে নাই।’
নির্বাচনের আগে আরও একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। যেখানে ‘অবৈধ নির্বাচন মানিনা মানব না’ শীর্ষক ক্যাপশনে বলা হচ্ছে এই নির্বাচন অবৈধ দাবি করে মশাল মিছিল করেছেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। আসলে এই মিছিলটি মনোনয়ন না পাওয়া কক্সবাজার জেলা বিএনপির এক প্রতিবাদ মিছিল।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের ছবি সংযুক্ত করে তৈরি এক ফটোকার্ড প্রচার করে দাবি করা হয়েছে রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেছেন, ‘তারেক রহমান হ্যাঁ ভোট দিলেও ছাত্রদল না ভোট দেবে’। কিন্তু ছাত্রদলের পক্ষ থেকে আদতে এ ধরনের কোনো বক্তব্য দেওয়া হয় নাই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই সময়ে ভোটের মাঠে কাউকে কাউকে ছোট করতেই এসব প্রচার চালানো হয়েছে। তবে সাধারণ ভোটাররা যদি প্রার্থীদের যোগ্যতা বিবেচনায় নিয়ে ভোট প্রদান করেন তাহলে আর এসব অপপ্রচার কাজে আসবে না। তবে এবারের নির্বাচনের আগে যে এ ধরনের অপপ্রচার চলানো হবে তা নিয়ে আগেই সতর্ক করেছিলেন বিশ্লেষকরা।
