সরেজমিন

ওয়াকারে ভর দিয়ে ভোটকেন্দ্রে ষাটোর্ধ্ব রাশিদা

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:৪৪ এএম

হেঁটে আসার শক্তি নেই। তাতে কী! ভোট তো দিতে হবে। এবার জেনেছেন একজনের ভোট অন্য কেউ দেওয়ার সুযোগ পাবে না। কেন্দ্রে গিয়ে ভোট না দিয়ে ফিরে আসতে হবে না। পড়তে হবে না কোনো হুমকি আর বাধার মুখে। সেজন্য শারীরিক অসুস্থতাও আটকাতে পারেনি ষাটোর্ধ্ব রাশিদা মামুনকে।

দুই হাতে ওয়াকারে ভর দিয়ে ঢাকা-১২ আসনের মগবাজার শেরেবাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিতে আসেন নয়াটোলার এ বাসিন্দা। সঙ্গে ছিলেন তার এক স্বজনও। শুধু ওয়াকারে ভর দিয়ে তিনি একা হাঁটতে পারেন না। সঙ্গে থাকা স্বজন যখন তাকে নিয়ে কেন্দ্রের গেট দিয়ে ঢুকছিলেন, তখন রাশিদার চোখেমুখে যেন তার ঈদের খুশি।

সাংবাদিক দেখে এবার থামলেন। কোমর সোজা করে একগাল হেসে ইশারায় কাছে ডাকলেন। বললেন, ‘বাবা একটা ছবি তোলো।’ ছবি তোলার পর সামনে এগোতে এগোতে অতীতে ভোট দিতে না পারার আফসোস করে বলেন, ‘অনেক বছর পর ভোট দিতে আসছি। ভালোভাবে আসছি, আল্লাহর রহমতে কোনো সমস্যা হয়নি। খুব ভালো লাগছে। সবসময়ই দেশে যেন এমন উৎসবের ভোট হয়। সবাই যেন শান্তিতে ভোট দিতে পারে।’

শেরেবাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজে পাঁচটি কেন্দ্র। ১১৯ নম্বর কেন্দ্রের একটি বুথে দুপুর ১২টার দিকে তরুণীদের খুব ভিড় লক্ষ করা গেছে। কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার সিয়াম সারওয়ার জানান, এ কেন্দ্রে ২ হাজার ৭৭২ জন ভোটার। বেলা পৌনে ১২টা পর্যন্ত ৪০৭ জন, অর্থাৎ ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট দিয়েছেন। তিনি বলেন, হুইল চেয়ারে ও ওয়াকারে ভর দিয়েও ভোটাররা আসছেন। সব বয়সী ভোটারই আসছেন। সকাল সাড়ে ৯টার পর থেকে তরুণ ভোটার আসছেন। সাড়ে ১০টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ২০০ জন ভোট দিয়েছেন।

এ আসনের ১২১ নম্বর কেন্দ্রে বেলা ১১টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে ১৪ দশমিক ২৭ শতাংশ। এ ছাড়া দুপুর ১টা পর্যন্ত কার্জন হল পরীক্ষা কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৩৩ শতাংশ। এ কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মো. আতিক মাহমুদ বলেন, দুপুর ১টা থেকে ভোটার উপস্থিতি বাড়ছে। কোনো ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

একই কেন্দ্রে আলাপ হয় জেন-জি ভোটার সাদিয়া আক্তারের সঙ্গে। তিনি বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। নাদিয়া বলেন, এর আগে ভোট দেওয়ার সুযোগ হয়নি। এবার প্রথম ভোট দিয়ে নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করেছি। ভোট দিতে পেরে খুবই খুশি।

দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদয়ন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেল, কেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি নেই। বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রের মূল ফটকের সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, সকালে ভোটারের উপস্থিতি বেশি ছিল, দুপুর থেকে কম আসছে। বিকেলের পর হয়তো বাড়তে পারে। তিনি বিষয়টি নিয়ে প্রিসাইডিং অফিসারের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। পরে ভোটকেন্দ্রের দ্বিতীয়তলা গিয়ে দেখা যায়, সেখানে গুটিকয়েক ভোটারের আনাগোনা। বিদেশি একটি পর্যবেক্ষক দল ভোটার ও ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্তদের সঙ্গে কথা বলছে। তাদের আলোচনা শেষে প্রিসাইডিং অফিসার বলেন, ‘এ কেন্দ্রে ভোট রয়েছে ১৯৫২টি। দুপুর ১টা পর্যন্ত ৫৫০ জন ভোট দিয়েছেন। অর্থাৎ এখানে ২৮ দশমিক ১৮ শতাংশ ভোট পড়েছে। এখন সোয়া ১টা বাজে, ভোটার উপস্থিতি কম, তবে শূন্য নয়। বিকেলে ভোটার বাড়তে পারে।’

দুপুর পৌনে ২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখা হয় নাদিয়া তাইশির সঙ্গে। তিনি ২০১৭ সালে ভোটার হলেও এবারই প্রথম ভোট দিতে এসেছেন। এর আগে ২০১৮ ও ২০২৪ সালে ভোট দিতে যাননি। নাদিয়া বলেন, ‘এবার ভোটের আগে মোবাইলে মেসেজ পেয়েছি। এর আগে কখনো পাইনি। আগে জানতাম আমার ভোট কেউ দিয়ে দিয়েছে, সেজন্য ভোট দিতে যাইনি। এবার বুঝেছি, কেউ আমার ভোট দিয়ে দিতে পারবে না। তাই ভোট দিতে এসেছি। এটাই জীবনের প্রথম ভোট। খুব ভালো লাগছে।’

ফেসবুক জুড়ে আঙুলে ভোটের ছাপের ছবি : শুধু কেন্দ্র আর সড়কে নয়; ভোট উৎসব, উচ্ছ্বাস বিরাজ করেছে ফেসবুক জুড়ে। সকাল থেকেই ভোট দেওয়ার পর অনেকেই ভোটকেন্দ্রে যাওয়া ও ভোট দেওয়ার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দিয়েছেন। অধিকাংশই স্টোরি আর টাইমলাইনে ভোটাধিকার প্রয়োগের প্রমাণ হিসেবে বৃদ্ধাঙ্গুলে ভোটের ছাপের ছবি তুলে পোস্ট করছেন। কেউ এককভাবে আবার কেউ বন্ধু-বান্ধবী কিংবা স্বজনরা মিলে আঙুলে ছবি পোস্ট দিয়েছেন। শুধু পোস্ট নয়; কেউ কেউ এই ছবি হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক মেসেঞ্জারে স্বজন কিংবা প্রিয়জনদের পাঠাচ্ছেন।

গতকাল বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ঘুরে দেখা গেছে, অনেকেই ভোট দিয়ে বের হয়ে বৃদ্ধাঙ্গুলের ছবি তুলছেন। এই বিষয়ে জানাতে চাইলে সিরাজুম মুনিরা জানান, তার বাসা কল্যাণপুর। বাবার বাসা যাত্রাবাড়ী। তিনি যাত্রাবাড়ীর ভোটার। গত রাতে ভোট দেওয়ার জন্য বাবার বাড়ি এসেছেন। উৎসবের ভোটের সাক্ষী হতে ফেসবুকে প্রমাণ রেখে দিয়েছেন।

ফেসবুকে আঙুলে ভোট প্রয়োগের ছাপের ছবি পোস্ট করে নায়িকা তর্মা মির্জা লিখেছেন, ‘ভোট প্রদান আপনার আমার নাগরিক অধিকার, আমরা ভোট দিয়েছি। স্বতঃস্ফূর্ত উৎসাহে আপনিও ভোট প্রদান করুন।’ উপস্থাপিকা আনিকা সাবরিনা লিখেছেন, ‘প্রথমবার ভোট দিলাম নিজের পছন্দের দলের জন্যে।’ সরদার ইনজামামুল হক লিখেছেন, ‘মহান দায়িত্ব পালন।’ রেবেকা সুলতানা লিখেছেন, ‘বলেন তো কাকে দিলাম।’ শারমিন নাহার লিখেছেন, ‘অবশেষে দিয়ে ফেললাম জীবনের প্রথম ভোট।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত