বিয়ে-সন্তানে অনীহা চীনাদের, তাই বলে কি রোবট সামলাবে দেশের অর্থনীতি?

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:২২ পিএম

চীনের জন্মহার বর্তমানে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশাল শ্রমশক্তির ক্রমহ্রাসমান উপস্থিতি এবং অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় আগামী দশকগুলোতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় নগদ অর্থ সহায়তা, কর ছাড় এবং বিয়ে সহজ করার মতো নানা পদক্ষেপ নিলেও পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতি হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে চীনের সামনে এখন নতুন সমাধান হিসেবে দেখা দিয়েছে ‘রোবট’ এবং ‘অটোমেশন’।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং গত কয়েক বছর ধরেই দেশটির উৎপাদন খাতকে আধুনিকায়ন ও স্বয়ংক্রিয় (অটোমেটেড) করার ওপর জোর দিচ্ছেন। বেইজিংয়ের মূল লক্ষ্য হলো চীনকে একটি স্বনির্ভর ও উচ্চপ্রযুক্তির শক্তিতে রূপান্তর করা। এই লক্ষ্যটি এখন দেশটির জনসংখ্যাগত ভারসাম্যের সংকটের সঙ্গে একীভূত হয়ে গেছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে চীনের পেনশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে এবং স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে উৎপাদনশীলতা ধসে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

হংকং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞ স্টুয়ার্ট গিটেল-বাস্টেন বলেন, ‘চীন যদি গত ২০-৩০ বছরের মতো একই ধারায় চলতে থাকে, তবে জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অমিলের কারণে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে। কিন্তু চীন কেন তা হতে দেবে?’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি সঠিকভাবে পরিচালনা করা যায়, তবে অটোমেশন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চীনকে জনসংখ্যাজনিত অর্থনৈতিক ধস থেকে রক্ষা করতে পারে। তবে ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষের দেশে এই রূপান্তর সহজ নয়। কারণ প্রযুক্তির এই বিপ্লব স্বল্প মেয়াদে অনেকের কর্মসংস্থান কেড়ে নিতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে কাজের ধরন বদলে দিতে পারে।

হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক গুওজুন হে বলেন, চীন যদি রোবট এবং এআই-এর মাধ্যমে শ্রমের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে, তবে কারখানায় কম শ্রমিক নিয়েও শিল্প উৎপাদন বজায় রাখা সম্ভব হবে। অটোমেশন সংকুচিত শ্রমশক্তির প্রভাব অনেকাংশে কমিয়ে দিলেও পুরোপুরি দূর করতে পারবে না।

ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ রোবোটিক্স-এর তথ্যমতে, চীন বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম শিল্প রোবট বাজার। ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে যত রোবট স্থাপিত হয়েছে, তার অর্ধেকেরও বেশি চীনে। দেশটির অনেক কারখানায় এখন রোবটিক হাত দিয়ে ঝালাই, রং করা এবং যন্ত্রাংশ সংযোজনের কাজ চলছে। এমনকি সেখানে ‘ডার্ক ফ্যাক্টরি’ বা অন্ধকার কারখানার সংখ্যা বাড়ছে, যেখানে মানুষের প্রয়োজন না থাকায় আলো জ্বালানোরও দরকার হয় না।

সাশ্রয়ী মূল্যে বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং সোলার প্যানেল তৈরি করে বিশ্ববাজারে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে চীন এই অটোমেশনকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। পাশাপাশি হিউম্যানয়েড বা মানুষের মতো দেখতে রোবট তৈরিতেও বিপুল বিনিয়োগ করছে দেশটি। বর্তমানে চীনে প্রায় ১৪০টিরও বেশি কোম্পানি সরকারি সহায়তায় এসব রোবট তৈরি করছে।

যদিও এসব হিউম্যানয়েড রোবট এখন পর্যন্ত মূলত টেলিভিশন শো বা প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ, তবে অনেক জায়গায় পরীক্ষামূলকভাবে এগুলোকে কারখানার অ্যাসেম্বলি লাইন, লজিস্টিক হাব এবং বিজ্ঞান গবেষণাগারে ব্যবহার করা হচ্ছে। নির্মাতাদের দাবি, খুব শিগগিরই এসব রোবট পণ্য বাছাই ও মান নিয়ন্ত্রণের মতো কাজে মানুষের সমকক্ষ হয়ে উঠবে।

২০১৫ সালে চীন যখন তাদের বিতর্কিত ‘এক সন্তান নীতি’ বাতিল করে, ঠিক সেই বছরই ‘মেইড ইন চীন ২০২৫’ পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্যই ছিল উচ্চপ্রযুক্তির এই যুগে শ্রমব্যয় বৃদ্ধি পেলেও যেন চীন তার প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা বজায় রাখতে পারে।

সূত্র: সিএনএন

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত