২০ বছর ধরে সংস্কার নেই পেকুয়া-কুতুবদিয়ার ৬ জেটিঘাট

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:৪৩ পিএম

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার সঙ্গে কুতুবদিয়ার লোকজনের বঙ্গোপসাগর পারাপারের একমাত্র মাধ্যম হলো মগনামা টার্মিনাল জেটিঘাট। এ ঘাট থেকে কুতুবদিয়ার হযরত মালেক শাহ (র:) এর মাজারসহ ৫টি পয়েন্টে এবং কক্সবাজার ফিশারীঘাট, মহেশখালীসহ বিভিন্ন স্থানে যাওয়া যায়। বঙ্গোপসাগরে আহরিত মাছ বিক্রির জন্যও প্রসিদ্ধ এই ঘাট। তাছাড়াও কুতুবদিয়া চ্যানেলের সৌন্দর্য্য উপভোগ করার জন্য প্রতিদিন এ ঘাটে ভিড় জমায় শত শত পর্যটক।

জানা যায়, যাত্রীদের দুর্ভোগ লাঘবে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ২০০৫ সালে ১২ আগস্ট মগনামা জেটিঘাটের নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পেকুয়া উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তর প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এ ঘাট নির্মাণ করার পরে কক্সবাজার জেলা পরিষদের হাতে হস্তান্তর করেন। এরপর থেকেই ঘাটটির বাৎসরিক ইজারা নিয়ন্ত্রণ করেন কক্সবাজার জেলা পরিষদ।

স্থানীয়রা জানায়, জেটি ঘাটটি কক্সবাজার জেলা পরিষদ বাৎসরিক ইজারা দিয়ে কোটি টাকা আদায় করলেও দীর্ঘ ২০ বছর ধরে ১ টাকার সংস্কার কাজও বাস্তবায়ন করেনি কর্তৃপক্ষ। তাছাড়া এলজিইডি ঘাট নির্মাণ করলেও সেটার ইজারা কর্তৃপক্ষ হিসেবে জেলা পরিষদ হওয়ায় দুই সরকারি বিভাগের টানাটানিতে ঘাটটি সংস্কার কাজ বাস্তবায়ন করা যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। যার ফলে বর্তমানে ঘাটটির এমন করুণ দশা হয়েছে যে কোন মূহুর্তে তা ভেঙ্গে পড়তে পারে। ইতিমধ্যে পিলার ও রেলিং এ বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে।
তথ্যসূত্র জানায়, মগনামা জেটিঘাটটির ইজারা ২ ভাগে বিভক্ত। জেটিঘাটের ইজারা দেয় কক্সবাজার জেলা পরিষদ। পারাপারের ইজারা দেয় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। আবার জেলা প্রশাসক ইজারা দেয় ২ ভাগে। একটি হচ্ছে মগনামা টু বড়ঘোপ টার্মিনাল জেটিঘাট আরেকটি হচ্ছে মগনামা টু দরবার লঞ্চ ঘাট।

অপরদিকে কুতুবদিয়া প্রান্তে রয়েছে ৫টি জেটিঘাট। সেগুলো হচ্ছে- দরবার লঞ্চঘাট, বড়ঘোপ টার্মিনাল জেটিঘাট, সাত্তার উদ্দিন টার্মিনাল জেটিঘাট, আলী আকবর ডেইল জেটিঘাট ও আকবর বলি জেটিঘাট। জেলা পরিষদ সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে মগনামা জেটিঘাটটি ১ কোটি টাকায় ইজারা দেয়া হয়েছে। অপরদিকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে মগনামা টার্মিনাল জেটিঘাট হতে বড়ঘোপ টার্মিনাল জেটিঘাট পারাপারের ইজারা দেয়া হয়েছে ২ কোটি ৯৪ লাখ টাকায়। আর মগনামা হতে দরবার লঞ্চ ঘাটটি একই দপ্তর থেকে পারাপারের ইজারা দেয়া হয়েছে ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকায়। একইভাবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে দরবার লঞ্চঘাটটি ইজারা দেয়া হয় ৭৫ লক্ষ টাকায় এবং আলী আকবর ডেইল জেটিঘাটটি ইজারা দেয়া হয় ১২ লাখ টাকায়। বিআইডাব্লিউটিএ বড়ঘোপ টার্মিনাল জেটিঘাট ইজারা দেয় ১ কোটি ২০ লাখ টাকায়। একই দপ্তর থেকে সাত্তার উদ্দিন টার্মিনাল জেটিঘাট ১৬ লাখ টাকায় এবং আকবর বলি ঘাট ইজারা দেয়া হয় ৫ লাখ টাকায়। অপরদিকে কুতুবদিয়ার সাত্তার উদ্দিন টার্মিনাল জেটিঘাট থেকে ছনুয়া জেটিঘাটের ইজারা দেয়া চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারের দপ্তর থেকে। সব মিলিয়ে হিসেব করলে সরকার বিভিন্ন দপ্তরের মাধ্যমে এসব জেটিঘাট থেকে বাৎসরিক রাজস্ব পায় প্রায় ৮ কোটি টাকার মত।

পারাপারের ইজারাদারের অধীনে মগনামা জেটিঘাট হতে বড়ঘোপ যাতায়াতের জন্য রয়েছে ৭টি স্পীড বোট আর লোকাল ডেনিস বোট রয়েছে ৫ টি। স্পীড বোটের ভাড়া রাখা হয় জনপ্রতি ৮০ টাকা এবং ডেনিস বোটে ভাড়া রাখা হয় ৩০ টাকা। এর বাইরে মালামালের টাকা গুনতে হয় আলাদা। তবে নৌকায় উঠার আগে ঘাটের ইজারাদারকে জনপ্রতি গুনতে হয় ৫ টাকা। একইভাবে মগনামা হতে দরবার লঞ্চঘাটে চলাচল করে ৫টি ডেনিস বোট ও ৫ টি স্পীড বোট। এ রুটেও যাত্রীদের ভাড়া গুনতে হয় একই।
মগনামা জেটি ঘাট থেকে বড়ঘোপ ঘাটে সীট্রাক সংযোগ করায় যাত্রী সেবায় কিছুটা স্বস্তি এলেও ওই সীট্রাকে উঠতে মুল জেটি এখন মরণফাঁদে পরিনত হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানাযায়, আলী আকবর ডেইল জেটিঘাট ইতিমধ্যে ভেঙ্গে বিলিন হয়ে গেছে। বড়ঘোপ জেটিঘাটটিও জর্জরিত। এসব ঘাট দিয়ে যাত্রীদের পারাপারে প্রতিনিয়ত অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। প্রতিনিয়ত মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে যাত্রীরা পারাপার করতে গিয়ে নানা প্রকার দূর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। সম্প্রতি স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিকে এসব বিষয়ে খবর প্রচারিত হলে মগনামা জেটি ঘাটটি পরিদর্শনে এসেছিলেন তদকালীন কক্সবাজার জেলা প্রশাসক সালাহউদ্দিন আহমদ। এসময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, জেলা পরিষদের বরাদ্দ থেকে শীঘ্রই মগনামা জেটি সংস্কারের জন্যে বরাদ্দ দেয়া হবে। ইতিমধ্যেই তা বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা জানালেও এখনো পর্যন্ত কোন প্রদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, মগনামা ঘাটের জেটির পিলার, রেলিং, পাটাতন জরাজীর্ণ হয়ে গেছে। ঘাটের দুপাশে নৌযান ভিড়ানো জন্যে নির্মিত ২টি সিঁড়ি মূল পাটাতন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ইজারাদার গাছের তক্তা দিয়ে কোনরকম মেরামত করে যাত্রী ও মালামাল ওঠানামা করতে দেখা গেছে। মগনামা জেটিঘাটের ইজারাদার নুরুল ইসলাম বলেন, শীঘ্রই জেটিঘাট সংস্কারের ব্যবস্থা করা না হলে যে কোন সময় জেটিটি অচল হয়ে পারাপার বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কুতুবদিয়ার বাসিন্দা মফিজুর রহমান বলেন, জেটিতে ওঠতে হয় আতংক নিয়ে।

মগনামা জেটিঘাট সংস্কারের বিষয়ে পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান মাহবুবের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জেলা পরিষদের সচিবের নেতৃত্বে একটি টীম পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করেছেন। কক্সবাজার জেলা প্রশাসক পরিদর্শন করে গেছেন দ্রুত সময়ে বরাদ্দ ছাড় নিয়ে কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান জানান, জেটি ঘাট সংস্কারের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত