জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল, ক্ষমতা হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি জাতির আশা, প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার প্রতিফলন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে যারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে জনগণের প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব পেয়েছেন, তাদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এই ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করা হবে? আজকের বাংলাদেশ দৃশ্যমান উন্নয়নের পাশাপাশি কিছু গভীর সংকটও বহন করছে। জননিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা, সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী এবং তোষামোদির রাজনীতি ইস্যুগুলো সাধারণ মানুষের জীবনে এক ধরনের আতঙ্ক হয়ে উঠেছে। জনগণ এখন আর শুধু প্রতিশ্রুতি চায় না; তারা চায় কার্যকর নেতৃত্ব, সাহসী সিদ্ধান্ত এবং অপরাধমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা। এই প্রেক্ষাপটে বিজয়ী সংসদ সদস্যদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রের অস্তিত্বের মূল ভিত্তি হলো, নাগরিকদের নিরাপত্তা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ আজ নিজেকে নিরাপদ মনে করে না। কোথাও সন্ত্রাসের ভয়, কোথাও চাঁদাবাজির চাপ, কোথাও কিশোর অপরাধের উত্থান এসব মিলিয়ে জনজীবনে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই অবস্থায় বিজয়ী এমপিদের প্রথম ও অগ্রাধিকার দায়িত্ব হওয়া উচিত, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে শিথিলতা বা যেকোনো রাজনৈতিক বিবেচনা রাষ্ট্রকে দুর্বল করে। জনগণ চায় এমন নেতৃত্ব যারা ভয় নয়, আইনের শক্তিতে সমাজ পরিচালনা করবে। সাধারণ মানুষের জীবনে সবচেয়ে দৃশ্যমান শোষণের নাম এখন সিন্ডিকেট। নিত্যপণ্যে বাজার থেকে শুরু করে পরিবহন, ভূমি ও নির্মাণ খাত সবখানেই কিছু গোষ্ঠী অদৃশ্য নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চাঁদাবাজির সংস্কৃতি যা ব্যবসা, কর্মসংস্থান ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজি কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ। এক্ষত্রে বিজয়ী সংসদ সদস্যদের নিতে হবে দৃঢ় ও আপসহীন অবস্থান। দলীয় পরিচয়, রাজনৈতিক আনুগত্য কোনো কিছুই যেন অপরাধীর ঢাল হতে না পারে।
ক্ষমতার চারপাশে সবসময় কিছু মানুষ ভিড় করে, যারা তোষামোদ করে, সুবিধা নেয়, আর আড়ালে চালায় অপরাধ। এই সন্ত্রাসী তোষামোদির সংস্কৃতি রাজনীতিকে কলুষিত করে এবং শেষ পর্যন্ত সরকার ও রাষ্ট্রকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। জনগণের প্রত্যাশা, একদম পরিষ্কার, সন্ত্রাসী তোষামোদিদের দূরে রাখুন। রাজনীতি হোক আদর্শ, সততা ও জনসেবার জায়গা। অপরাধীদের আশ্রয় দিলে উন্নয়ন ও সুশাসন দুটোর একটিও টেকসই হবে না। সুশাসনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসে তখনই, যখন অপরাধী ক্ষমতার কাছের মানুষ। যদি তখন আইন নীরব থাকে, তবে সাধারণ মানুষের কাছে রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা ভেঙে পড়ে। বিজয়ী এমপিদের দেখাতে হবে, অপরাধী যেন কোনোভাবেই প্রশ্রয় না পায়। তাদের শাস্তি হবে প্রকৃত আইনের মাধ্যমে, নিরপেক্ষ এবং দৃশ্যমানভাবে। এতে হয়তো স্বল্পমেয়াদে কিছু রাজনৈতিক অস্বস্তি তৈরি হবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি জনগণের আস্থা বহুগুণ বাড়াবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও প্রশাসন যদি রাজনৈতিক প্রভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে ন্যায়বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হবে। অপরাধ দমন তখন ব্যক্তিনির্ভর ও পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে পড়ে। জনগণের প্রত্যাশা পুলিশ ও প্রশাসনকে পেশাদার, নিরপেক্ষ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা। একজন জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব প্রশাসন চালানো নয়, বরং নীতিগত দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করা।
এটি ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি। সন্ত্রাস ও মাদকের পাশাপাশি কিশোর অপরাধ আজ নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিষয়টি কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক সংকট। আজ যে কিশোর অপরাধে জড়াচ্ছে, কাল সে সমাজের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। এই ক্ষেত্রে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগে আইন প্রয়োগ। এ জন্য শিক্ষা, পরিবার ও সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বিজয়ী সংসদ সদস্যদের ভূমিকা হতে হবে সমন্বয়কের, যাতে প্রতিরোধ ও পুনর্বাসন একসঙ্গে অগ্রসর হয়। জনগণ ভোট দেয় বিশ্বাসের ওপর। সেই বিশ্বাস ভেঙে গেলে উন্নয়ন, অবকাঠামো বা স্লোগান কিছুই টিকে থাকে না। তাই জনগণের আস্থা রক্ষা করাই হোক, বিজয়ী সংসদ সদস্যদের প্রধান নৈতিক দায়িত্ব। একজন সংসদ সদস্য মানে শুধু নিজের আসন নয়; মনে রাখতে হবে তিনি সমগ্র জাতির প্রতিনিধি। সংসদে তার বক্তব্য, বাইরে তার আচরণ সবকিছুতেই প্রতিফলিত হতে হবে দায়িত্ববোধ ও সংযম।
গণতন্ত্রে মতভেদ, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে দল নয়, দেশকে অগ্রাধিকার দেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। সংকটে ঐক্য, অপরাধে কঠোরতা এবং উন্নয়নে ধারাবাহিকতাই একটি রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেয়। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সিদ্ধান্তের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। আজ যদি ন্যায়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা না হয়, তাহলে তার মূল্য দিতে হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। জনপ্রতিনিধিদের প্রতিটি সিদ্ধান্তে থাকতে হবে জবাবদিহির মানসিকতা। কারণ ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। শেষ পর্যন্ত সংসদ সদস্যদের প্রতি প্রশ্ন একটাই, আমরা কী ধরনের বাংলাদেশ রেখে যেতে চাই? ভয়, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসে জর্জরিত একটি রাষ্ট্র নাকি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে আজকের বিজয়ী সংসদ সদস্যদের সিদ্ধান্ত, আচরণ ও সাহসের ওপর। আগামী ৫ বছর নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই, এটা মনে রাখতে হবে। কারণ দীর্ঘ সময় পর দেশের মানুষ পূর্ণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদেরকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন। ভাবতে হবে, জনগণের একটি ভোট মানে ন্যূনতম একটি স্বপ্ন। তাদের সেই স্বপ্ন যেন অপূর্ণ না থাকে। তাহলে সেই পুরনো না পাওয়াই বারবার তাড়া করবে। ঠিক সেই মুহূর্তেই মানুষ স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।
লেখক : সমাজকর্মী ও কলাম লেখক
