‘এভাবে হেরে যাওয়ার চেয়ে ম্যাচ বয়কট করাই ভালো ছিল’ ভারতের কাছে ৬১ রানে হেরে যাওয়ার পর পাকিস্তানের ক্রিকেট ভক্তদের এমনটাই সুর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে পতাকা হাতে জার্সি গায়ে মাঠে যাওয়া দর্শক, সবার কণ্ঠেই একই হতাশা। এমন নয় যে বিশ্বকাপে এবারই প্রথম পাকিস্তানকে হারিয়েছে ভারত, বরং এটাই নিয়মিত দৃশ্য। এখন পর্যন্ত ওয়ানডে বিশ্বকাপে আটবার মুখোমুখি হয়ে একবারও ভারতকে হারাতে পারেনি পাকিস্তান, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ৯ বার মুখোমুখি হয়ে সাত জয় ভারতের, যার বিপরীতে এক জয় পাকিস্তানের, একটা ম্যাচ অফিশিয়ালি টাই, তবে বোল-আউটে জয়ী হয়েছিল ভারতই। একপেশে লড়াইতে পরিণত হওয়া এই ম্যাচকে ঘিরে উত্তাপটা তাই ক্রমশ হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক, যার প্রতিফলন মাঠের খেলায় সামান্যই।
ম্যাচশেষে সংবাদ সম্মেলনে ভারতের অলরাউন্ডার অক্ষর প্যাটেল স্পষ্টই বলে দিয়েছেন, এখন আর পাকিস্তানকে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখেন না, ‘আমরা তাদের একটা দল হিসেবেই দেখি। আমরা এখন সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা যা কিছু আছে এসব নিয়ে ভাবি না। আমরা একটা দলের বিপক্ষে খেলছি, এর বাইরে আমরা নিজেদের নিয়েই ভাবছি। তাই যখনই আমি খেলি, তখন অন্য কিছু নিয়ে ভাবি না। আমি ব্যাপারটা স্রেফ একটা ম্যাচ, আর অন্য সব প্রতিপক্ষের মতো করেই দেখি। আমি ওসব প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা অন্যকিছু নিয়ে ভাবছি না। একটা প্রতিপক্ষ খেলতে এসেছে আর আমরা ভালো ক্রিকেট খেলেছি, এই তো।’ তবে পাকিস্তানের কোচ মাইক হেসন সংবাদ সম্মেলনে জানালেন, এখনো পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের কাছে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটা একটা বড় উপলক্ষ, ‘আমরা জানি, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ একটা বড় ঘটনা। এই মুহূর্তে ড্রেসিংরুমে সবাই খুব বিমর্ষ, কারণ সবাই জানে পাকিস্তানের কাছে এই ম্যাচটা কতটা অর্থবহ। আমরা সত্যিই খুব হতাশ, কারণ আমরা ভালো খেলতে পারিনি।’ দুই দলের দুই প্রতিনিধির শব্দচয়নেই স্পষ্ট, ভারত এখন আর পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচকে ঘিরে বাড়তি স্নায়ুর চাপ নেয় না, যেটা সীমান্তের ওপারে পুরোই বিপরীত।
৪০ ওভারের ম্যাচের স্থায়িত্ব ছিল ৩৮ ওভার, তবে টি-টোয়েন্টি ম্যাচের যে টানটান উত্তেজনা, নাটকীয় সমাপ্তির রোমাঞ্চ যেটা দেখা গেছে আফগানিস্তান-দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা ইংল্যান্ড-নেপাল ম্যাচেও, ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথে দেখা যাচ্ছে না এর ছিটেফোঁটাও। বিবিসির হয়ে বিশ্বকাপের ম্যাচটা কভার করা সাংবাদিক নাথান জোনসের ভাষায়, ‘মাঠের আশপাশে নকল জার্সির দাম বেড়ে গেছে, নিরাপত্তার কারণে স্টেডিয়ামের কয়েক কিলোমিটার আগেই গাড়ি থেকে নেমে যেতে হয়েছে, ব্যাগ তল্লাশির জন্য লম্বা লাইন, হোটেলে এত থিকথিকে ভিড় যে মোহাম্মদ সিরাজও সকালে বের হতে গিয়ে লিফটে জায়গা পাননি। ম্যাচের আগে ভারতীয় ব্যান্ড দল হনুমানকাইন্ড আর তাদের আগুনের খেলা দেখানোর দল মাঠে পারফর্ম করল ধুরন্ধর ছবির গানে, যে ছবিটা পাকিস্তানে নিষিদ্ধ হয়েছে।’ দর্শকদের আগ্রহ, ম্যাচকে ঘিরে ব্যবসায়িক কর্মকা- আর সম্প্রচার সংস্থাগুলো সম্ভাব্য সব সাবেক ক্রিকেটারদের একজোট করে নানান ভূমিকায় সংযুক্ত করে যে ম্যাচটা পরিবেশন করার চেষ্টা করে বিশ্বকাপে, টানা বেশ কয়েকটা আসর ধরেই সেটা পানসে এবং একতরফাই হয়ে যাচ্ছে। আকাশ চোপড়া একটা টিভি চ্যানেলে ম্যাচের পর বলেই দিয়েছেন, ‘একটা সময় ভারতের সমর্থকরা বলত পাকিস্তানকে হারিয়ে দাও আর কিছুই চাই না, বিশ্বকাপ না জিতলেও চলবে। এখন আর ব্যাপারটা একদমই সে রকম নেই। আমাদের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় পাকিস্তানকে হারানো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে এটাই এখন আর ভারতের ক্রিকেট সমর্থকদের প্রত্যাশার শেষ বিন্দু নয়। তাদের প্রত্যাশা এখন আরও বেশি। তবে একই কথা আমি পাকিস্তানের বেলায় বলতে পারছি না, বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছে তাদের পরিচয় এখনো ভারতের সঙ্গেই লটকে আছে।’
ইংল্যান্ডের ক্রিকেটার মইন আলি তার নিয়মিত পডকাস্ট ‘বিয়ার্ড বিফোর উইকেট’ অনুষ্ঠানে বলেছেন পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ের মান পড়ে যাওয়ার কথা, ‘একটা সময় ভারতের ছিল সেরা ব্যাটিং আর পাকিস্তানের সেরা বোলিং। ভারতের ঐতিহাসিকভাবেই স্পিনাররা ভালো, সিমাররা ততটা ভালো ছিল না যতটা পাকিস্তানের ছিল। এখন পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ের শিল্প হারিয়ে যাচ্ছে আর ভারতের সিমাররা দারুণ শক্তিশালী হয়ে উঠছে। সিরাজ সাদা বলে দুর্দান্ত বোলার, তাকে বসে থাকতে হচ্ছে। এখন দুই দলে যতটা ফারাক, আগে কখনো এতটা ছিল না। এর মূল কারণ আইপিএল। আইপিএলে ভারতের ক্রিকেটাররা যে চাপটা নেয়, সেটা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চেয়ে বেশি না হলেও মোটেও কম নয়।’
পাকিস্তানের মহিলা দলের সাবেক অধিনায়ক সানা মিরের চোখে, দলে প্রচুর অদল-বদল করাটাই পাকিস্তান দলের প্রধান সমস্যা, ‘আমরা খালি খেলোয়াড় বদলাই, আমরা উদ্বোধনী জুটিই কয়েকবার বদলেছি। হাসান নাওয়াজকে একসময় বলা হয়েছে প্রজন্মান্তরের প্রতিভা, এখন সে নেই। মোহাম্মদ ওয়াসিম জুনিয়রকে দুই বছর ধরে গড়ে তোলা হলো, সেও এখন নেই। মিডল অর্ডারে ইরফান নাওয়াজি আসত, এখন সেও নেই।’
বাস্তবতার নিরিখে তাই ভারত-পাকিস্তান বাণিজ্যিকভাবে এখনো সোনার ডিম পাড়া হাঁস, তবে সেটা শুধুই রাজনৈতিক কারণে। মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এই ম্যাচের আবেদন এখন পড়তির দিকে।
