গোলপোস্ট থেকে ক্রীড়াঙ্গনের অভিভাবক

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:৫৩ এএম

আমিনুল হকের ক্রীড়াঙ্গনের অভিভাবক হওয়াটা এক প্রকার অনুমিতই ছিল। ৫ আগস্টের পর থেকে নিয়মিত শিরোনাম হয়েছেন ক্রীড়াঙ্গনের নানা বিষয়ে কথা বলে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ক্রীড়া সম্পাদক হিসেবে গেল দেড় বছরে দেশব্যাপী ক্রিকেট-ফুটবলসহ নানা খেলা আয়োজন করেও প্রশংসা পেয়েছিলেন। সব কিছুই চলছিল ঠিক। তবে ১২ ফেব্রুয়ারি হিসাবটা বদলে যায় হুট করেই। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৬ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ছিলেন আমিনুল। তবে ভোটের লড়াইয়ে হেরে যান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর কাছে। সেই হারে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। আমিনুলকে টেকনোক্র্যাট কোটায় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার দাবি ওঠে ক্রীড়া সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে। এত এত নির্বাচিত সংসদ সদস্য থাকতে আমিনুলকে সে দায়িত্ব কি দেওয়া হবে? এই সংশয় অবশেষে দূর হয় মঙ্গলবার যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আমিনুলের শপথ গ্রহণের মাধ্যমে। এক সময়ের গোলপোস্টের বিশ্বস্ত প্রহরী এখন দেশের ক্রীড়াঙ্গনের অভিভাবক। একেবারে মাঠ থেকে ক্রীড়ামন্ত্রী এর আগে পায়নি দেশ। এমনকি টেকনোক্র্যাট কোটায়ও আগে কেউ পাননি এ দায়িত্ব। আমিনুল এই দুই নজির স্থাপন করলেন।

২০১৪ সালের ৫ মার্চ থেকে সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া। সেদিন প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কাছ থেকে নিয়েছিলেন দলের প্রাথমিক সদস্যপদ। এরপর থেকেই নানা লড়াই-সংগ্রাম, ঘাত-প্রতিঘাত, হামলা-মামলা মোকাবিলা করে আমিনুল হয়ে ওঠেন এক পরিপূর্ণ রাজনীতিবিদ। বিগত হাসিনা সরকারের আমলে রাজপথে ছিলেন সম্মুখসারির যোদ্ধা। পুলিশি বর্বরোচিত হামলা সইতে হয়েছে অসংখ্যবার। সরকারবিরোধী আন্দোলন করতে নেমে হতে হয়েছে রক্তাক্ত, পড়তে হয়েছে হাতকড়া। বারবার করতে হয়েছে কারাবরণ। এসব আত্মত্যাগের মূল্যই পেলেন আমিনুল। ভোটের লড়াইয়ে হারার পরও তাকে সে পুরস্কারটা দিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়া তারেক রহমান।

সেই খেলোয়াড়ি জীবন থেকেই বেগম খালেদা জিয়ার ভীষণ পছন্দের ছিলেন আমিনুল। বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসনের প্রয়াণ দিনে সে কথা নিজেই দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছিলেন আমিনুল, ‘দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কে আসলে বলে শেষ করা যাবে না। আমি যেদিন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিতে যোগ দিলাম, সেদিনটি আমার মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কারণ আমাদের প্রিয় নেত্রী সেদিন আমাকে তার সন্তানের মতো তার একজন ক্ষুদ্র কর্মী হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। আমি যখন বক্তব্য দিচ্ছিলাম, আমার তো রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল না, আমি একটা জায়গায় এসে আটকে গিয়েছিলাম, তিনি পাশ থেকে আমাকে কী বলতে হবে বলে দিয়েছিলেন। একজন নেত্রীর কর্মীদের প্রতি যে ভালোবাসা, যে আন্তরিকতা এটি আসলে ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না এবং আমার বক্তব্যের পরে তিনি যখন বক্তব্য দিয়েছিলেন, তিনি বলেছিলেন, তোমরা যে দুঃসময়ে বিএনপির সঙ্গে আছো আমি এবং আমার দল সবসময় তোমাদের মূল্যায়ন করব। তোমাদের সর্বোচ্চভাবে আমরা সহযোগিতা করব।’ বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান সেই মূল্যায়নটা করেছেন আমিনুলকে টেকনোক্রেট কোটায় প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়ে।

স্বাধীনতা-পরবর্তী মোট ২৮ জন ব্যক্তি ক্রীড়াঙ্গনের অভিভাবকের দায়িত্বে ছিলেন। তবে একেবারে মাঠের কাউকে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে দেখা যায়নি। বিএনপি আমলে এর আগে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন পাঁচজন। এদের কেউই সেভাবে ক্রীড়াক্ষেত্রের মানুষ ছিলেন না। টুকটাক সম্পৃক্ততা থাকলেও সেটা আমিনুলর মতো নয়। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সর্বশেষ মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ছিলেন নাজমুল হাসান পাপন। এ দায়িত্ব পাওয়ার আগে প্রায় এক যুগ তিনি ছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি। সেভাবে দেখলে পাপন ছিলেন খেলার জগতের মানুষ। তবে তার আগের পরিচয়টাই বেশি অর্থবহ। তিনি ছিলেন দেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের ছেলে। উত্তরাধিকার সূত্রেই পাপন রাজনীতিক বনে গিয়েছিলেন। অতীতে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়াদের কারও প্রথম পরিচয় ছিল না খেলাধুলা। এখানেও অনন্য আমিনুল।

খেলোয়াড়ি জীবনে আমিনুল পেয়েছিলেন তারকাখ্যাতি। ফুটবলে যখন ভাটার টান, ঠিক সে সময়টায় তার আবির্ভাব এবং বলা যেতে পারে আমিনুলের পর সেভাবে বড় কোনো তারকার খোঁজ দেশের ফুটবলে মেলেনি। ১৯৯৪ সালে ঢাকা মোহামেডানের বয়সভিত্তিক দলে খেলার আমিনুলের ফুটবলের মহাসড়কে পা রাখা। তবে শীর্ষ ফুটবলে তার শুরুটা পুরান ঢাকার ক্লাব ফরাশগঞ্জের মাধ্যমে। ১৯৯৯-২০০০ মৌসুমে তিনি যোগ দেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্রে। টানা পাঁচ মৌসুম ক্লাবের হয়ে খেলেই বলতে গেলে আলোচনায় আসেন। ২০০৫-০৬ মৌসুমে ব্রাদার্স ইউনিয়নে যোগ দিয়ে টানা দুই মৌসুম খেলেন। এরপর আসেন মোহামেডানে। অবসরের আগে অবশ্য আবাহনী, শেখ জামাল ধানম-ি ক্লাবের মতো বড় দলে দাপটের সঙ্গে খেলেছেন সাবেক এই তারকা গোলকিপার। ২০১১-১২ মৌসুমে মোহামেডানে খেলে অবসরের সিদ্ধান্ত নেন।

জাতীয় দলেও তিনি খেলেছেন দাপটের সঙ্গে। দেশের বড় সব সাফল্যের সাক্ষী আমিনুল বাংলাদেশকে দীর্ঘদিন নেতৃত্বও দিয়েছেন। ১৯৯৯ সালে আন্তর্জাতিক অভিষেকের পর দেশের জার্সিতে ৫০টি ম্যাচ খেলেছেন। তিনি ছিলেন ১৯৯৯ সালে প্রথম সাফ গেমস সোনাজয়ী বাংলাদেশ দলের সদস্য। এরপর ২০০৩ সাফজয়ী দলের গোলকিপার ছিলেন আমিনুল। তার নেতৃত্বে ২০১০ এসএ গেমসে সোনা জিতেছিল স্বাগতিক বাংলাদেশ। ফুটবলের আড্ডায় প্রায়ই সর্বকালের সেরা গোলকিপারের তর্কে উঠে আসে আমিনুলের নাম। ২০০৪ সালে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব নিউক্যাসেল ইউনাইটেড তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তবে সে সময় যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে চুক্তিটি করতে পারেননি।

খেলা ছাড়ার অনেক আগে থেকেই অবশ্য আমিনুল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শকে লালন করে গেছেন। তাই খেলা ছাড়ার পর তিনি সক্রিয় হন রাজনীতিতে। খেলার মাঠের তারকাখ্যাতি কাজে লাগিয়ে বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সান্নিধ্য পেয়েছেন। এরপর মূলধারার রাজনীতিতে জড়িয়ে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। তার মূল্যটা পেলেন মন্ত্রিত্ব পাওয়ার মধ্য দিয়ে। তবে আমিনুলের জন্য এ এক গুরুদায়িত্ব। খেলার মানুষ বলেই তার কাছে প্রত্যাশাটা আকাশচুম্বী। সেই প্রত্যাশা পূরণে আমিনুল হক সফল হবেন কি-না, সেটা সময়ই বলে দেবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত