নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ বড় চ্যালেঞ্জ বললেন বিদ্যুৎমন্ত্রী

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:০৫ এএম

রমজানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ রাখাই বর্তমান লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি বলেন, ‘এমন একটা খাতে আর এমন একটা সময়ে আসছি; কাল (আজ) থেকেই রোজা শুরু হবে। বিদ্যুৎ ছাড়া কিছুই হয় না। রোজায় যত কম সম্ভব লোডশেডিং দেব, কারিগরি কারণে যেটা হয় সেটা আলাদা বিষয়।’

গতকাল বুধবার দুপুরে সচিবালয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে প্রথম দিনের অফিসে এসে সাংবাদিকদের কাছে এমন মন্তব্য করেন তিনি। এর আগে নিজ দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি সবার সহায়তা চান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, ‘এখন প্রথম লক্ষ্য রোজা ও সেচ, এই দুটি ম্যানেজ করে তারপর অন্য পরিকল্পনা। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বড় চ্যালেঞ্জ।’

বকেয়া পরিশোধ করা না হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখা নিয়ে ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপপা) শঙ্কা-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বিপপা যদি এই কথা বলে থাকে তাহলে নতুন সরকারকে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শামিল হবে। বকেয়া পরিশোধ নিয়ে তাড়াহুড়ো না করে সরকারকে সময় দিতে হবে।

এ মন্ত্রণালয়ে আগেও কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে জানিয়ে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশ ফার্স্ট। আমাদের কাছে বাংলাদেশ ফার্স্ট। আমরা চাই না, মন্ত্রণালয় দলীয় লোক দিয়ে পরিচালিত হোক। প্রশাসনের কাজ হবে দেশের কাজ করা, এর বাইরে অন্য কোনো কাজ নেই। আমরা চাই এমন একটা প্রশাসন থাকুক, যার কাজ থাকবে শুধু বাংলাদেশ নিয়ে।’

কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রীকে জানানো হয়, সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানির কাছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) বকেয়া দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা। এই বকেয়া দ্রুত পরিশোধ না করা হলে সামনে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। এ বিষয়টি বিদ্যুৎমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে জানালে তিনি অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বসে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

বৈঠকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ পৃথকভাবে পেপার উপস্থাপন করে। এ সময় সেখানে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে এক বিভাগ অন্য বিভাগের ওপর দায় চাপানোর প্রবণতা দেখা যায়। বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, রমজানে লোডশেডিংমুক্ত থাকতে হলে দৈনিক অন্তত ৯০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন, যা এপ্রিল থেকে বেড়ে দৈনিক ১১০ কোটি ঘনফুটে দাঁড়াবে।

এর জবাবে জ্বালানি বিভাগ জানায়, বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক ৯০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করাই এখন কঠিন। জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, দেশে প্রতিদিন গ্যাস উৎপাদন কমছে। দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট হলেও সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ২৬০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে ব্যবহার করা হয় মোট গ্যাসের প্রায় ৬০ শতাংশ। বিদ্যুতের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ বাড়ালে শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। বৈঠকে আরও জানানো হয়, ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের ১৫০ কিলোমিটারের বগুড়া-সৈয়দপুর পাইপলাইন এবং ২০ ইঞ্চি ব্যাসের ভেড়ামারা-খুলনা ১৬৩ কিমি পাইপলাইন অব্যবহৃত রয়েছে।

 

গ্যাস চুরি :  জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, তিতাস, বাখরাবাদসহ বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানিতে ‘সিস্টেম লস’-এর নামে ব্যাপক গ্যাস চুরি হচ্ছে। বর্তমানে শুধু তিতাস গ্যাসের সিস্টেম লস ১০ শতাংশের বেশি। এলএনজি আমদানির মূল্য ধরলে এ খাতে লোকসান ৬ হাজার কোটি থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা। এ অবস্থায় আগামী ১০০ দিনের মধ্যে সিস্টেম লস ৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বৈঠকে মন্ত্রী জানতে চান, এক শতাংশ সিস্টেম লস কমাতে পারলে কী রকম সাশ্রয় হবে? জবাবে জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, সিস্টেম লস এক শতাংশ কমলে বছরে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হয়। এরপরই গ্যাস চুরি ও অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন মন্ত্রী।

জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গ্যাস সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থায় লস, লিকেজ ও চুরির হার বর্তমানে ৬.৮৮ শতাংশ। এর ফলে প্রতিদিন প্রায় ১৭০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস অপচয় হচ্ছে। বার্ষিক হিসাবে যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৪ হাজার ৪৮ কোটি টাকা।

নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন কমতে থাকায় এলএনজি আমদানিতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার চাপ তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৬ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি ধরা হয়েছে ৬ হাজার কোটি টাকা। আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী ২০২৬ সালের মধ্যে জ্বালানি ভর্তুকি পুরোপুরি তুলে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রাও রয়েছে।

নেটওয়ার্ক সীমাবদ্ধতা : পরিকল্পনা অনুযায়ী মহেশখালীতে চতুর্থ ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন হলে দৈনিক আরও প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আমদানির সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের মাধ্যমে দৈনিক আরও এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যমান গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইনের সীমাবদ্ধতার কারণে এই অতিরিক্ত গ্যাস পুরোপুরি সঞ্চালন করা সম্ভব নয়। বর্তমানে দেশের গ্যাস সঞ্চালন ব্যবস্থার সর্বোচ্চ সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও আনোয়ারা-ফৌজদারহাট পাইপলাইনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস পরিবহন করা যায় না। ফলে নতুন এফএসআরইউ ও স্থলভিত্তিক টার্মিনাল থেকে আমদানিকৃত অতিরিক্ত গ্যাস গ্রিডে যুক্ত হলেও তা জাতীয়ভাবে বিতরণে বড় সংকট তৈরি হবে।

এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি বিভাগ মহেশখালী থেকে বাবরখানা পর্যন্ত নতুন সমান্তরাল গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণকে জরুরি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।  পাশাপাশি ভোলার গ্যাস খুলনা ও ঢাকায় আনার জন্য নতুন পাইপলাইন নির্মাণ, অফশোর ও অনশোর অনুসন্ধানে নতুন ব্লক বরাদ্দ এবং মডেল পিএসসি-২০২৬ চূড়ান্ত করে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বৈঠকে আরও আলোচনা হয়, এলপিজি সংকট, জ্বালানি তেলের সীমিত মজুদ এবং সনাতন পদ্ধতিতে তেলের অপচয় ও চুরির বিষয়টি। বর্তমানে দেশে ৪০টি এলপিজি অপারেটরের লাইসেন্স থাকলেও সক্রিয় রয়েছে মাত্র ছয়টি, যার ফলে বাজারে এলপিজির সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানানো হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত