বাটলারের আক্ষেপ

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:১৭ এএম

গতকাল গভীর রাতে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে দেশ ছেড়েছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল।

১ মার্চ থেকে অস্ট্রেলিয়ার তিন শহরে শুরু হবে ওমেন্স এশিয়ান কাপ। এশিয়া অঞ্চলে শীর্ষ এ আসরে প্রথমবার খেলার সুযোগ পাচ্ছেন বাংলাদেশের মেয়েরা। গত বছর জুলাইয়ে বাছাইপর্ব উতরে এশিয়ার সেরা ১২ দলের এ আসরের যোগ্যতা অর্জন করে বাংলাদেশ। এরপর কেটেছে আট মাস। বড় মঞ্চের জন্য যে মানের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত ছিল, সেটা নিতে পারেনি দল। দেশ ছাড়ার আগে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে না পারার ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন ব্রিটিশ কোচ পিটার বাটলার। অধিনায়ক আফঈদা খন্দকার অবশ্য তারপরও ভালো ফুটবল উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের নারী ফুটবল কমিটির প্রধান মাহফুজা আক্তার কিরণ সবকিছু পরিকল্পনামতো ব্যবস্থা করতে না পারার অসহায়ত্ব প্রকাশ করে প্রকারান্তরে বাফুফে শীর্ষ নেতৃত্বকে দাঁড় করিয়েছেন কাঠগড়ায়...

পিটার বাটলার বরাবরই স্পষ্টবাদী। কোনো কিছু পছন্দ না হলে সরাসরি সমালোচনা করেন। কাউকে ছাড় দেন না। বৃহস্পতিবার এশিয়ান কাপের প্রস্তুতি নিয়ে বলতে গিয়ে আবারও সমালোচনামুখর হলেন কোচ। বড় আসরকে সামনে রেখে অনেক আগেই যে প্রস্তুতির পরিকল্পনা করেছিলেন ৫৯ বছর বয়সী কোচ, সেটা বাস্তবায়নে দায়িত্ব ছিল বাফুফের। তবে ফুটবল নিয়ন্তা সংস্থা পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। বাফুফের এক শীর্ষ কর্তা অবশ্য কদিন আগে বলেছিলেন, দলের প্রস্তুতির সব সিদ্ধান্তই বাটলারের। সে কথার বিরোধিতা করে তিনি বলেছেন, দলের সাফল্য-ব্যর্থতার দায় তখনই তিনি নেবেন, যখন বাফুফে থেকে সব দায়িত্ব তার ওপর চাপানো থেকে সরে আসবে। বাফুফের অনেকের ফুটবলজ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তুলে কোচ সাফ জানিয়েছেন, তিনি কারও হাতের পুতুল নন।

প্রারম্ভিক বক্তব্যেই প্রস্তুতি ঘাটতি নিয়ে হতাশা ঝরে পড়েছে বাটলারের কথায়, ‘আমার মা সবসময় আমাকে বলতেন, যত কম কথা, তত কম ঝামেলা। তবে মাঝেমধ্যে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার জন্য মুখ খুলতেই হয়। আমাদের প্রস্তুতি নিয়ে অনেক মিথ্যাচার করা হয়েছে। আমি খুব বেশি কিছু বলব না, তবে বাস্তবতা হলো প্রস্তুতি আদর্শ মানের হয়নি। আমি কারও দিকে আঙুল তুলে দোষারোপ করছি না। আমাদের একটি পরিকল্পনা ছিল, সেটা বাস্তবায়িত হয়নি। আমি একজন বাস্তববাদী মানুষ এবং এই দলের জন্য আমিই দায়বদ্ধ। তবে আমি শুধু তখনই দায়ভার নেব, যখন মানুষ মিডিয়ায় গিয়ে এটা বলা বন্ধ করবে যে সবই ‘বাটলারের পরিকল্পনা’ বা ‘বাটলারের দোষ’। আমি লাইবেরিয়া, বতসোয়ানা, ইংল্যান্ড এবং মালয়েশিয়ার মতো অনেক আন্তর্জাতিক দল পরিচালনা করেছি; আমি কারও হাতের পুতুল নই। আমি সবসময় সংবাদমাধ্যম এবং খেলোয়াড়দের সঙ্গে সত্য ও সততার পথে চলা মানুষ।’

এশিয়ান কাপে অভিষেকেই বাংলাদেশকে দিতে হবে অগ্নিপরীক্ষা। ৩ মার্চ তাদের প্রতিপক্ষ ইতিহাসের সবচেয়ে সফল চীন (৯ বারের চ্যাম্পিয়ন)। পরের ম্যাচেই তাদের খেলতে হবে দ্বিতীয় সফল উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে। আর শেষ গ্রুপ ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ উজবেকিস্তান। সব দিক থেকে এগিয়ে থাকাদের বিপক্ষে দল কোন কৌশলে খেলবে জানতে চাইলে বাটলার বলেন, ‘আমাদের কিছুটা পরিবর্তন ও পরিমার্জন করতে হবে। দলের প্রায় ৪৮ শতাংশ খেলোয়াড়ের বয়স ২০ বছরের নিচে এবং তাদের মানসিকতা বেশ আক্রমণাত্মক; আমি চাই না তারা সেই ধারা থেকে বেরিয়ে আসুক। তবে একই সঙ্গে, আমাদের দায়িত্ব এবং পরিস্থিতি সম্পর্কেও আমি সচেতন। আমাদের লক্ষ্য হলো বিধ্বস্ত না হয়ে একটি গ্রহণযোগ্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পারফরম্যান্স উপহার দেওয়া। আপনি যদি কোনো বাছবিচারহীন বা আলসেমি মানসিকতা নিয়ে শীর্ষ দলগুলোকে প্রেসিং বা আক্রমণ করতে যান, তবে বড় ধরনের ধাক্কা খাবেন।’

ফুটবল কর্তাদের ফুটবলজ্ঞানের পরিধি নিয়ে প্রশ্ন তুলে বাটলার বলেন, ‘বাফুফের অনেকেই সেই পর্যায়ের ফুটবল বোঝে না। অনেকেই শুধু জয়-পরাজয় দিয়ে অনেক সময় ভেতরের সমস্যা ঢেকে ফেলতে চায়। প্রথম ১০ মিনিটে দুই গোল, পরের ১০ মিনিটে আরও দুই গোল করাই সব নয়। আসল বিষয় হলো ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, যা আপনার ভবিষ্যৎ গড়ে দেবে। গুরুত্বপূর্ণ হলো, দুই বছর পর আবার ফিরে আসা, আবারও যোগ্যতা অর্জন করা। সাফল্যকে ধরে রাখতে হলে ধারাবাহিকতা প্রয়োজন।’

বাফুফে কর্তারা মেয়েদের প্রস্তুতি নিয়ে অনেক সময় অনেক কথাই বলেছেন। তাদের মুখেই শোনা গেছে মধ্যপ্রাচ্য, জাপান, মালয়েশিয়ায় ক্যাম্প করা ও প্রীতি ম্যাচ খেলার কথা। তার কোনোটাই অবশ্য বাস্তবায়িত হয়নি। এতেই মূলত ক্ষেপেছেন বাটলার, ‘বেশি বিস্তারিত না বলে আমি শুধু এটাই বলব যে, যেকোনো ম্যাচ খেলার আগে আপনাকে প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রস্তুতিই সব। আপনি হুট করে কিছু করতে পারেন না। মালয়েশিয়ার সঙ্গে আমাদের খেলা না হওয়ার কারণ মিস কিরণ (নারী কমিটির প্রধান) ভালো জানেন। আমরা যে তারিখগুলো দিয়েছিলাম বা চিঠি আদান-প্রদান হয়েছিল, সেগুলোর সঙ্গে লিগের তারিখের মিল ছিল না। প্রস্তুতির চেয়ে লিগ বেশি অগ্রাধিকার পেয়েছিল। ফিলিপাইনের বিপক্ষে ১৯ ফেব্রুয়ারি খেলার কথা ছিল এবং ১৪ তারিখে আমাদের দেশ ছাড়ার কথা ছিল। কিন্তু লিগের তারিখ পেছানোর ফলে হয়নি। ১০ এবং ১৩ তারিখে ম্যাচ খেলে কীভাবে ১৯ তারিখে ফিলিপাইনের বিপক্ষে খেলা যায়? মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রেও তাই, তারিখগুলো ভুল ছিল এবং লিগের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। মিস কিরণ সেটি জানেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত