ফেব্রুয়ারির হালকা বিকেল। বাতাসে ধুলো নেই, আছে এক ধরনের নীরব উত্তেজনা। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সাদা স্তম্ভগুলো যেন ধুয়ে-মুছে নতুন করে দাঁড়িয়েছে ইতিহাসের সামনে। কেউ রঙ করছে, কেউ তুলির ডগায় আঁকছে বর্ণমালা, কেউবা মেঝেতে আলপনার নকশায় এঁকে দিচ্ছে ভাষার প্রতি ভালোবাসা। চারদিকে একটাই অনুভূতি একুশ আসছে।
একুশে ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-২০২৬ উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার শিল্পী ও শিক্ষার্থীরা বেদি পরিষ্কার, আলপনা আঁকা এবং চত্বরের রঙতুলির কাজ নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন। এ যেন কোনো সাধারণ প্রস্তুতি নয়; বরং স্মৃতির পুনর্জন্ম। তুলির আঁচড়ে জেগে ওঠা ইতিহাস। আজ শুক্রবার রাত থেকে ফুল হাতে জনতার ঢল শহীদ মিনারে উপস্থিত হবে।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রস্তুত করতে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী নিরলসভাবে কাজ করছেন। শুধু মূল মিনার নয়, আশপাশের দেয়ালে বর্ণমালা লিখন এবং ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সংবলিত গ্রাফিতি তৈরির কাজও চলছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও অস্থায়ী কন্ট্রোল রুম তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীদের চোখে ক্লান্তি নেই, আছে এক ধরনের তৃপ্তি। মেঝেতে টানা সাদা লাইনগুলো ধীরে ধীরে রঙে ভরে উঠছে। আলপনার ভেতর ফুটে উঠছে অক্ষর, ফুল, রক্তলাল সূর্যের প্রতীক যেন প্রতিটি নকশাই বলছে ৫২-এর গল্প। কেউ হাঁটু গেড়ে বসে সূক্ষ্ম রেখা টানছে, কেউ দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখে নিচ্ছে পুরো কম্পোজিশন। তাদের কাছে এটি শুধু কাজ নয় এ এক ধরনের শ্রদ্ধা নিবেদন, যেখানে রঙ হয়ে ওঠে ভাষা আর নকশা হয়ে ওঠে ইতিহাস।
মিনারের গায়ে পড়েছে নতুন সাদা রঙের প্রলেপ। সেই সাদা যেন শুধু রঙ নয়, এ যেন পবিত্রতার প্রতীক। পরিষ্কার করা বেদিটাকে দেখলে মনে হয়, এইমাত্র কেউ এসে ফুল রেখে গেছে, যদিও সময় এখনো আসেনি। পেছনে বসানো হবে প্রতীকী লাল সূর্য, যে সূর্য রক্তের, ত্যাগের, আবার নতুন দিনেরও।
শুধু মূল বেদি নয়, আশপাশের দেয়ালও যেন কথা বলতে শুরু করেছে। বর্ণমালার গ্রাফিতি, ভাষা আন্দোলনের দৃশ্য সব মিলিয়ে পুরো এলাকা এক খোলা ক্যানভাস। এখানে ইতিহাস বইয়ের পাতা নয়, দেয়ালে আঁকা থাকে। যখন ঘড়ির কাঁটা বারো ছুঁইছুঁই করবে তখন ফুল হাতে মানুষের ঢল নামবে। নিঃশব্দ হেঁটে আসবে মানুষ। কেউ খালি পায়ে, কেউ সন্তানকে নিয়ে, কেউ একা। কিন্তু সবার হাতে থাকবে একই ভাষার ভালোবাসা।
