ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, দেশটি ক্রমেই এমন এক অবস্থানে উপনীত হয়েছে যেখানে তারা সমঝোতার চেয়ে সংঘাতের মধ্যেই টিকে থাকার সম্ভাবনা বেশি দেখছে। তেহরানের নীতিনির্ধারকদের কাছে একটি চূড়ান্ত লড়াই এখন আর কেবল বিপর্যয় নয়, বরং একে তারা দেখছেন ক্ষমতার পটপরিবর্তনের মোড় হিসেবে।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় যখন মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইরানের প্রতিনিধি দল আলোচনায় ব্যস্ত, ঠিক তখনই তেহরানে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এক কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধবিমানবাহী রণতরীর চেয়েও বেশি বিপজ্জনক হলো সেই অস্ত্র, যা ওই রণতরীকে সমুদ্রের তলদেশে পাঠিয়ে দিতে পারে।’ খামেনেইর এই বক্তব্য ইরানের বর্তমান মনোভাবেরই প্রতিফলন।
পূর্ববর্তী আলোচনাগুলোতে ইরান সাধারণত ‘শান্তিকামী কিন্তু যুদ্ধে সক্ষম’—এই নীতিতে অটল থাকত। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দৃশ্যপট অনেকটাই ভিন্ন। তেহরানের ক্ষমতাঘনিষ্ঠ মহল এখন আর আলোচনার মাধ্যমে কোনো সফল চুক্তির আশা করছে না। সরকারি প্রচারমাধ্যমে এখন যুদ্ধকে কেবল একটি সম্ভাবনা নয়, বরং সম্ভাব্য সুবিধাজনক পথ হিসেবে চিত্রায়িত করা হচ্ছে।
ইরানি নীতিনির্ধারকদের আলোচনায় বারবার ফিরে আসছে লিবিয়ার উদাহরণ। তাদের মতে, মুয়াম্মার গাদ্দাফি যখন নিজের অস্ত্র কর্মসূচি ত্যাগ করেছিলেন, তখন থেকেই দেশটিতে বিদেশি হস্তক্ষেপ ও অভ্যন্তরীণ ভাঙন শুরু হয়, যা শেষ পর্যন্ত তার পতন ডেকে আনে। তেহরানের একাংশ মনে করে, পশ্চিমা শক্তির সাথে কোনো চুক্তিতে আসা মানেই হবে পতনের শুরু। বিপরীতে, যুদ্ধ করলে অন্তত কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা, যুদ্ধবিরতি এবং সরকারের বৈধতা ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ইরানের রাজনৈতিক ভাষায় ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক অনুষঙ্গ সব সময়ই ছিল, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা আরও প্রকট হয়েছে। বর্তমান সংঘাতকে তারা কেবল ভূ-রাজনৈতিক লড়াই নয়, বরং একটি ‘সভ্যতার লড়াই’ হিসেবে দেখছে। রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, যেকোনো মূল্যে প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়াই হলো বিশ্বাসের পরীক্ষা।
সামরিক কমান্ডাররা এখন কেবল প্রতিরক্ষার কথা বলছেন না, বরং তারা যুদ্ধের জন্য পূর্ণ প্রস্তুতির বার্তা দিচ্ছেন। তাদের ভাষায়, বস্তুগত শক্তির চেয়ে খোদায়ী শক্তির ওপর ভরসা করাই বিজয়ের মূল চাবিকাঠি। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে সামরিক পরাজয় বা আত্মত্যাগকেও ‘আধ্যাত্মিক বিজয়’ হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ রয়েছে।
তেহরানের নেতৃত্বের কাছে কৌশলগত হিসাবটি অত্যন্ত জটিল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো চুক্তিতে আসার অর্থ হলো- ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, পারমাণবিক কার্যক্রম এবং আঞ্চলিক প্রভাবের ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা মেনে নেওয়া। দেশটির শাসকরা বিশ্বাস করেন, এই ধরনের আপস তাদের শাসনব্যবস্থার মূল স্তম্ভগুলোকে দুর্বল করে দেবে এবং শেষ পর্যন্ত অস্তিত্বের সংকটে ফেলবে।
অন্যদিকে, যুদ্ধকে তারা তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন। অতীতে দেখা গেছে, বাহ্যিক সংঘাত ইরানে বড় ধরনের গণঅভ্যুত্থান ঘটায়নি, বরং যুদ্ধের পরিস্থিতি অনেক সময় অভ্যন্তরীণ সংহতি বাড়িয়ে দেয়।
ইরানের সামরিক নীতি মূলত ‘অপ্রতিসম যুদ্ধ’ এবং আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তারা মনে করে, একটি সীমিত আঘাতকে যদি বৃহত্তর সংকটে রূপ দেওয়া যায়, তবে প্রতিপক্ষকে তাদের অনুকূল শর্তে আলোচনায় বসতে বাধ্য করা সম্ভব হবে।
ইরানের জন্য এক অদ্ভুত প্যারাডক্স বা কূটাভাস তৈরি হয়েছে। আলোচনার উদ্দেশ্য যেখানে যুদ্ধ এড়ানো, সেখানে তেহরানের বর্তমান ব্যবস্থার কাছে আলোচনার মাধ্যমে দেওয়া ছাড়গুলো যুদ্ধের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল
আবারও পিছিয়ে গেল নাসার চন্দ্রাভিযান ‘আর্টেমিস-২’
আজ টানা ৬ ঘণ্টা গ্যাস থাকবে না যেসব এলাকায়