নবাগত সরকারের কাছে প্রত্যাশা

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:৫২ এএম

নবাগত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত ধরে, নতুন বাংলাদেশের পথচলা শুরু হয়েছে। নতুন সরকার গঠিত হলো গত ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। বাংলাদেশের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। গণতন্ত্র উত্তরণের পথে এ এক বহুল কাক্সিক্ষত যাত্রা। ১৬ বছরের ধারাবাহিক গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রাম এবং তৎপরবর্তী ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার সফল গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে, দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদ থেকে বাংলাদেশের জনগণ মুক্ত হয়েছে। ২০২৪-এর জুলাই আগস্টে হাজারো প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে, আহত হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার চূড়ান্ত এই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে, বাংলাদেশের রাজনীতি বিভিন্ন চড়াই-উতরাই পেরিয়েছে। তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী উত্তরণ, অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা। তাই জনমানুষের প্রত্যাশাও জুলাই-পরবর্তী বর্তমান সরকারের কাছে অনেক বেশি। কোনো ব্যক্তি বা দল যেন দেশে ফ্যাসিজম প্রতিষ্ঠা করতে না পারে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে কেউ যেন ফ্যাসিস্ট না হয়ে ওঠে এটাই বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

বিগত কয়েক দশকে বিভিন্ন সরকার দেশের অভিভাবক হিসেবে ব্যর্থ হয়েছে এবং তৎপরবর্তী সময়ে আমাদের সন্তানসম ছাত্র এবং দেশের জনতা রাস্তায় নেমে আসতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশকে যাতে এমন পরিস্থিতিতে আর ফিরে যেতে না হয়, এজন্য দরকার শক্তিশালী রাষ্ট্রকাঠামো এবং সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা। গত ১৬ বছরে ফ্যাসিস্ট সরকার বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও জনপ্রশাসনকে নিজেদের ইচ্ছামতো ব্যবহার করেছে। এর ফলে অনেক মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে এবং সইতে হয়েছে  সীমাহীন নিপীড়ন। কয়েকটি বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারকে হরণ করা হয়েছে। মানুষকে ধাবিত করা হয়েছে এক নজিরবিহীন ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে। নবাগত সরকারের স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সবল করে তুলতে হবে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর অনাস্থাসহ দেশের অর্থনীতিতে বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে। কর-জিডিপি অনুপাত বাংলাদেশে পাশর্^বর্তী সব দেশ থেকে সবচেয়ে কম। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ব্যবসা ও ব্যক্তি পর্যায়ে কর প্রদানের প্রক্রিয়াকে ঝামেলা ও দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। সরকারকে ব্যয় সংকোচনের নীতি গ্রহণ করে বাজেট-ঘাটতি কমিয়ে আনতে হবে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অতি সম্প্রতি কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও, তা এখনো ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছে। অর্থ পাচার রোধ, হুন্ডি নিয়ন্ত্রণসহ বাংলাদেশ ব্যাংকে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যাতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পায়। ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়ানোর জন্য প্রবাসীদের সচেতন করা, প্রণোদনা বৃদ্ধি এবং সহজে যাতে বৈদেশিক মুদ্রা পরিবার-পরিজনের কাছে পৌঁছাতে পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অর্থ পাচারকারী, ব্যাংক লুটেরাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য শক্ত আইনি ভিত্তি তৈরি ও প্রয়োগ করতে হবে।    দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে মানুষের মধ্যে অস্বস্তি রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ক্ষেত্রবিশেষে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি দেখা গেছে। দুর্বলের ওপর সবলের অত্যচার, মব ভায়োলেন্স ইত্যাদি দেখা গেছে। নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শপথ গ্রহণের পরই যে কোনো মূল্যে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে হবে এবং কোনো ধরনের সহিংসতা, প্রতিশোধ বা উসকানিমূলক কর্মকান্ড করার সুযোগ দেওয়া যাবে না। আমরা নতুন সরকারের অধীনে আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ বসবাসস্থল হিসেবে দেখতে চাই। যেখানে নিরীহ, দরিদ্র, নারী ও শিশুসহ সবাই নিরাপদ থাকবে। দলমত, ধর্ম-বর্ণ কিংবা অন্য যে কোনো ভিন্নতার অজুহাতে  দুর্বলের ওপর সবলের আক্রমণ প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। এ জন্য আইনের শাসন ও ন্যায়পরায়ণতাই হতে হবে মূল আদর্শ। ‘দল-মত, ধর্ম, দর্শন যার যার, রাষ্ট্র সবার’ এই নীতির আলোকে একজন বাংলাদেশি হিসেবে প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিকের সমান অধিকারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। দেশের সর্বস্তরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, তা না হলে জুলাই ’২৪-এর সব অর্জন বৃথা হয়ে যাবে। আইন সবার জন্য সমান হবে। এখানে কোনো প্রকার বৈষম্য করা যাবে না। আইনের প্রয়োগও হতে হবে বিধিবদ্ধ নিয়মে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপরেও কোনো জুলুম যাতে না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। জুলুম বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ছিল। আমরা জুলাই পরবর্তী সময়ে এই অবস্থা আর কোনোভাবেই দেখতে চাই না। সবার জন্য বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ জায়গা হিসেবে তৈরি করতে হবে। বেকারত্ব বাংলাদেশের বড় একটি সমস্যা। আমাদের ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। বিশ্ব বাজারের জন্য আমাদের জনশক্তিকে দক্ষ করে তুলতে হবে, উন্নত বিশ্বে অনেক দেশে আমাদের দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে যদি সঠিক প্রশিক্ষণ এবং কাক্সিক্ষত দেশের ভাষা শেখানো যায়, তাহলে আমাদের জনগণকে জনশক্তিতে রূপান্তর করা যাবে। এতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনসহ বেকারত্ব অনেকাংশে দূর করা যাবে। কর্মসংস্থান তৈরি করা জরুরি। সে জন্য আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে আমাদের জনশক্তিকে এগিয়ে নিতে হবে। বর্তমান যুগে দক্ষ না হলে টিকে থাকা কঠিন হবে তাই আমাদের যুবসমাজকে কোনো না কোনো কাজে পারদর্শী হতে হবে। কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশের যুবশক্তিকে কার্যকরীভাবে কাজে লাগানোর জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিশ^বিদ্যালয়ের সঙ্গে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর সংযোগ বাড়াতে হবে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী গ্রাজুয়েট তৈরি করতে হবে। যাতে তারা শিক্ষাজীবন শেষেই চাকরিতে যোগদান করতে পারে। সরকারি চাকরিতে যোগদানের জন্য আলাদা আলাদা পরীক্ষা, ঢাকাকেন্দ্রিক পরীক্ষা, উচ্চ পরীক্ষা ফি, দীর্ঘসূত্রতা, প্রশ্নফাঁস ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিয়ে ভাবতে হবে। এতে পাস করা যুবকদের সময়, অর্থ ও শ্রম বাঁচবে। বাংলাদেশের আইন, বিচার ও পুলিশ বিভাগ সংস্কারে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে জুলাই সনদে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলসহ বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল ঐকমত্য হওয়া সংস্কার প্রস্তাবনা বাস্তবায়নে প্রথম দিকেই পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।

জুলাই সনদে যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে সেই বিষয়গুলো জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে গঠিত সরকারকে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সুরাহা করতে হবে। আইনসম্মত করে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করলে, ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের গণআকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন হবে। উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকারকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। উদ্যোক্তারা যাতে সহজ শর্তে ঋণ নিয়ে উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারে; তাদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। তারা শিল্প সম্প্রসারণ এবং নতুন নতুন শিল্প স্থাপনায় এগিয়ে আসবেন সে রকম আস্থার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নতুন উদ্যোক্তারা যদি শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ান তাহলে কর্মসংস্থানও তৈরি হবে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগেও দেশে এক স্থবিরতা দেখা গেছে। নতুন সরকারকে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে কার্যকরী পদক্ষেপ ও পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। গ্রাম ও শহরের উন্নয়ন যাতে সমানভাবে এগিয়ে যায়। নতুন সরকারকে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনায় অনেক বেশি অর্থের অপচয় হয় আমাদের দেশে এছাড়া খরচের মাত্রাও পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে অনেক বেশি। সরকারকে এসব জায়গায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। অটোমেশন গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের জন্য। সর্বত্র দেশের মানুষের চাহিদা অনুযায়ী প্রযুক্তির ব্যবহার কার্যকর করা গেলে মানুষের সময় ও অর্থ বাঁচবে। একই সঙ্গে দুর্নীতিও কমে আসবে। ক্যাশলেস সোসাইটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। এতে আর্থিক দুর্নীতিও কমে আসবে।

বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। পুলিশ প্রশাসনকে আরও বেশি শক্তিশালী ও কার্যকরী করতে হবে। একইভাবে মনে রাখতে হবে যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনোভাবেই রাজনৈতিক দলের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কাজ না করে। বিগত সরকার গুম, খুন ও রাজনৈতিকভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে ন্যক্কারজনক সব কাজ বাস্তবায়ন করেছে। যার ফলও হয়েছে তাদের জন্য ভয়াবহ। বৈষম্য ও দুর্নীতিমুক্ত একটি দেশ বহুল কাক্সিক্ষত বাংলাদেশের জন্য। ইনসাফের বাংলাদেশের এই দেশের আপামর জনগণের চাওয়া। একটি কল্যাণ রাষ্ট্র হয়ে উঠবে বাংলাদেশ, যেখানে একজন নাগরিকের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত হবে গণতান্ত্রিকভাবে। অধিকার প্রাপ্তির জন্য যাতে বাড়ির নিজের গৃহে থাকা কোনো শিশুর প্রাণ দিতে না হয়। মানবাধিকার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে মহান স্বপ্ন নিয়ে এদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে মানুষের সেই স্বপ্ন পূরণের দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম উত্তর জনগণের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর প্রধানমন্ত্রী  তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন প্রবীণ-নবীনের সমন্বয়ে যে মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে। ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে নৈতিক দৃঢ়তা বজায় রেখে দেশ পরিচালনা করা হলে লক্ষ্যে পৌছানো অসম্ভব কাজ নয়।

লেখক: উপাচার্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত