কথা দেওয়া আর রাখার মধ্যে পার্থক্য আছে। রাজনৈতিক ময়দানে ওয়াদা দেওয়া সহজ, কিন্তু তার বাস্তবায়ন কঠিন। সেটা এখন বুঝতে পারছেন নতুন সরকারপ্রধান তারেক রহমান ও তার মন্ত্রীরা। আমাদের সংবিধানে অনেক ওয়াদাই লিপিবদ্ধ আছে, কিন্তু ব্যবহারিক জীবনে তার ছিটেফোঁটাও নেই। শিক্ষার মতো একটি মৌলিক মানবাধিকার তৃণমূল থেকে রাজধানী পর্যন্ত একই রকম থাকার কথা, কিন্তু বাস্তবে নেই। সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠাকে গুরুত্ব দেওয়া, তা কি হয়েছে? হয়নি। নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকারের সুরক্ষা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সামাজিক সাম্য ও তাদের মানব সত্তার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হবে, বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কিছুই ঠিকভাবে হয়নি। গণতন্ত্রই তার শেকড় সমাজ-মননে, কাঠামোতে গাড়তে পারেনি ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার প্রতিযোগিতার কারণে। গত ৫৪ বছরেও সংবিধান প্রদত্ত আইন ও কর্মপদ্ধতি, প্রশাসন ও সামাজিক ন্যায় সুরক্ষিত হয়নি। কোনো ক্ষেত্রে একটু-আধটু সেবা মিললেও, বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বঞ্চিত থেকে গেছে। এমনকি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায়ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে দলিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী।
সামাজিক নিগ্রহ ও অস্পৃশ্যতার শিকার ব্যক্তিবর্গের তোলা অভিযোগও প্রতিকার পায় না। তাদের সমাজের সর্বনিম্ন মানুষ হিসেবে গণ্য করে প্রশাসনের তৃণমূলও দুর্ব্যবহার করে। এই বিভাজন অনৈতিক ও অসাংবিধানিক। এটা মানবাধিকার হরণ, সন্দেহাতীতভাবে। দলিত ও পতিত বলে তাদের সাংবিধানিক অধিকার হরণ রাষ্ট্রের নিয়োজিত লোকেরা যা করছে, তা কেবল ওই একটি ক্ষেত্রেই বিদ্যমান নয়, সামাজিক পরিসরেও তা ব্যাপকভাবেই রয়েছে। রাজধানীর প্রাথমিক ও গ্রামীণ এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ব্যাপক বৈষম্য রয়েছে। প্রথমত যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের রেখে দেওয়া হয় মহানগরে, আর দুর্বল, অদক্ষ, কম দক্ষ বা মানহীন শিক্ষকদের দিয়ে চালানো হয় গ্রামের বিদ্যালয়। এটা যে আইনের চোখে সংবিধান লঙ্ঘন ও অপরাধমূলক, সেটা রাষ্ট্রযন্ত্রই নির্বিবাদে করছে। ফলে গ্রামের স্কুল-কলেজ থেকে ভালো ফল পাই না আমরা। যোগ্য শিক্ষার্থীও রাজধানীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন লাভ করতে পারে না। কারণ, শিক্ষকগণও মননগতভাবে বৈষম্যের ধারক। কারণ আমরা এমন এক কালচারাল হেজেমনির শিকার যাকে চিহ্নিত করা যেতে পারে পরাধীনতা বলে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর ধারণা করা হয়েছিল, এবার বৈষম্য দূর করার ব্যবস্থা হবে। কিন্তু তা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা কেউ তৃণমূলের নিগৃহীত মানুষ নন, তাই তাদের হৃদয়ে সামাজিক বৈষম্য, প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য নিরসনের কোনো উদ্যোগ ভাবনা ছিল না। নির্বাচন-উত্তর সরকারের পক্ষে এখনই এই বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে আমরা মনে করি। কারণ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ফসল এই সরকার। এবং সমাজ ও প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বৈষম্যের উপাদানগুলো তিরোহিত করতে হবে এখনই। না হলে যে রাজনৈতিক ওয়াদা বিএনপি দিয়েছে, যে ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালাচ্ছে তা সুশাসনে রূপ লাভ করবে না। সুশাসনের প্রধান উপাদানই হলো গণমানুষের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার সর্বত্র বাস্তবায়ন। এটা মনে রাখতে হবে যে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার লক্ষ্য পূরণ করতে হলে রাজনৈতিক মানসিকতাকে ঢেলে সাজাতে হবে। শুধু প্রধানমন্ত্রী সেই পথে এগোলে হবে না, তার সহকর্মীদের এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উচিত হবে নতুন সরকারপ্রধানের পথ অনুসরণ করা। আমাদের মতো গরিব দেশের প্রশাসনিক কর্তাদের ভাবা উচিত যে, তাদের বাবা-মাও গ্রামের মানুষ। গ্রাম হচ্ছে খাদ্যশস্য উৎপাদনের মূল। কৃষিই আমাদের অর্থনীতির ভিত্তি। সেই ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে হলে সর্বত্র বৈষম্যবিহীন পরিবেশ প্রতিকার পোক্ত করতে হবে। বৈষম্যহীন একটি সমাজই পারে দ্রুত উন্নয়নের পথ দেখাতে। আমরা যেন প্রতিনিয়তই ভুল পথে না হাঁটি, সেটা নিশ্চিত করাও দরকার।
