অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকারের চিন্তায় বিএনপি। নির্বাচনী ওয়াদা পূরণের দুটি বিষয় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। নতুন সরকারের কাঁধে পাহাড় সমান সমস্যা থাকলেও, এই দুটি বিষয়কে কেন অগ্রাধিকার দেওয়া হলো তা সহজেই বোঝা যায়। নারী জীবনের বেদনাকে ঘুচিয়ে, একটি স্বাস্থ্যপ্রদ পরিবার-পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে তারেক রহমান সরকার তার গণকল্যাণমুখী কাজের পরিকল্পনা রক্ষা করতে যাচ্ছে। গণমুখী এই চিন্তা বিএনপির অগ্রগামী পরিকল্পনাতেই ছিল। দলের ৩১ দফা তার নমুনা। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এতকাল বঞ্চিত থেকে গেছে প্রায় সব ক্ষেত্রে। সেই বঞ্চনা নিরসনে নারীকে পরিবারের কেন্দ্রবিন্দুতে বসানোর পরিকল্পনা, তাদের ক্ষমতায়নের সিঁড়িতে নিয়ে এলো সরকার। এর আগে খালেদা জিয়া সব শিশুকে বিনাবেতনে শিক্ষা নেওয়ার রাষ্ট্রীয় সুযোগ দিয়ে ক্ষমতার ধারা উন্মুক্ত করেছিলেন। নারীই হবেন কার্ডের মালিক। প্রতি কার্ডে আড়াই হাজার টাকা দেওয়া হবে। শুরুতে পাবে সাড়ে ৬ হাজার পরিবার। এটি পাইলট প্রকল্প, পর্যায়ক্রমে প্রান্তিক গ্রামের হতদরিদ্ররাই পাবে এই কার্ড। দরিদ্র, নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারকে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে স্বস্তি দিতে এই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এটি মাস্টার কার্ড হিসেবে পরবর্তী সময়ে ব্যবহৃত হবে।
ন্যাশনাল আইডি ও ফ্যামিলি কার্ড সামাজিক জীবনধারায় একটি শুভ অবদান রাখবে বলে মনে করা যায়। এ কারণে এই কার্ড বিতরণে যেন স্বজনপ্রীতি, দলপ্রীতি, বৈষম্য না হয় সে কথা বলেছেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন। আর সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী এই কর্মসূচিকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেছেন, ন্যায়ের ভিত্তিতে কার্ড বিতরণ নিশ্চিত করার কথা। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন ২০২৬-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে। কিউআর কোডযুক্ত ডিজিটাল স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ হবে। চারটি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করা হয়েছে ফ্যামিলি কার্ডের বিষয়টিকে। হতদরিদ্র, দরিদ্র, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত। সরকার ফ্যামিলি কার্ডসংক্রান্ত ডেটাবেজ তৈরি করছে। স্বচ্ছতা আনতে ও অনিয়ম প্রতিরোধে এনআইডি ভিত্তিতে প্রতিটি পরিবারের তথ্য এই ডেটাবেজে সংরক্ষিত থাকবে। তার মানে, কোমর বেঁধে নামতে যাচ্ছে সরকার। ওয়াদাগুলো যে কেবল নির্বাচনে জেতার জন্য নেওয়া হয়নি, ৩১ দফার ঘোষিত মেনিফেস্টোও তার প্রমাণ। এ সরকার যে জনগণের সরকার সেটা প্রমাণের এটা একটি সবচেয়ে ভালো উদ্যোগ। নারীর ক্ষমতায়নই কেবল নয়, বেঁচে থাকার সংগ্রামে সহায়তা দিলেই হবে না। তারা যাতে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে, সে কথা মনে রাখতে অনুরোধ করি।
সরকারকে কর্মসংস্থানে সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। অর্থাৎ পড়াশোনোর স্তর ও মান অনুযায়ী চাকরির বাজার সৃষ্টি করে ফ্যামিলি কার্ডধারী নারী ও তার পুত্র-কন্যাদের নিয়োগের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রণোদনা দিতে হবে, যাতে তারা নিজ উদ্যোগেই কর্মসংস্থান করে স্বাবলম্বী হয়। বিশেষ করে নিত্যপণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে নিজেদের নিয়োগ করে। ফ্যামিলি কার্ডের ওপর যেন তারা নির্ভরশীল না হয়ে ওঠে, সে ব্যাপারে সরকারের তৃণমূলের কর্মকর্তাদের, বিশেষ করে ইউপি সদস্য ও চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রাসরুটে কর্মতৎপর থাকতে হবে। যদি গ্রামসরকার ব্যবস্থা চালু করা হয় তাহলে তাদের ওপরও কিছু দায়িত্ব অর্পিত হতে পারে। চিকিৎসার জন্য তৃণমূলের মানুষ যেন জেলা সদরে না যেতে পারে, সে জন্য কমিউনিটি হেলথ সেন্টারগুলোকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। মহানগরের চেয়ে গ্রামে দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। মহানগর ও জেলা শহরে যাতে বস্তি না থাকে, সে ব্যাপারে সামাজিক পুনর্বাসন কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে। এ কাজ সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ইনক্লুসিভ কাজ। এটা মন্ত্রীসহ কর্মকর্তাদের মনে রাখতে হবে। কেবল ফাইলের কাজ করলেই হবে না, জনকল্যাণ এবং দরিদ্র মানুষের প্রতি দায় ও কর্তব্য পালনে মানবিক হতে হবে। মনে রাখতে হবে, তৃণমূলের লোকই তাদের আসল মালিক।
