দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজের প্রথম ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণ দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত মঙ্গলবার প্রথা অনুযায়ী, দেশটির কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ও নিম্নকক্ষ হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের (প্রতিনিধি পরিষদ) যৌথ অধিবেশনে তিনি এই ভাষণ দেন। বরাবরের মতো নিজের ভাষণে ট্রাম্প বিশ্ব জুড়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিরসন ও শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়াসের জন্য নিজের কৃতিত্ব জাহির করেন। দেশ জুড়ে অপরাধের হার নাটকীয়ভাবে কমার কৃতিত্বও দাবি করেন তিনি। তার ভাষণে অভিবাসন, অর্থনীতি প্রাধান্য পেয়েছে। বছরের শেষদিকের নির্বাচনে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো লাগতে পারে, রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের এ উদ্বেগ কমাতে ট্রাম্প মঙ্গলবার তার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ভাষণের প্রথম ঘণ্টা ব্যয় করেছেন অর্থনীতি নিয়েই। বলেছেন, তিনি মূল্যস্ফীতি শ্লথ করেছেন, স্টক মার্কেটকে রেকর্ড উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, ব্যাপক কর কমানো ও ওষুধের দাম কমানোর আদেশে স্বাক্ষর করেছেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ এ ভাষণেও তিনি যথারীতি নানা সত্য-মিথ্যা দাবি ও অভিযোগ করেছেন; যা তার চিরাচরিত রূপেরই পুনঃমঞ্চায়ন।
স্টেট অব দ্য ইউনিয়নে ভাষণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বার্ষিক ভাষণ। এতে তিনি কংগ্রেস ও জনগণকে জানান, দেশের অবস্থা কী, গত বছরে কী কাজ হয়েছে এবং সামনে কী পরিকল্পনা আছে। ট্রাম্প যখন ভাষণ শুরু করেন, তখন তার সমর্থকরা ‘ইউএসএ’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন। আগেই ট্রাম্প আভাস দিয়ে বলেছিলেন, এটি একটি দীর্ঘ ভাষণ হতে যাচ্ছে; কারণ আমাদের অনেক কিছু বলার আছে। মঙ্গলবার রাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল ভবনের হাউজ চেম্বার থেকে তার এই ভাষণ দেন। এতে তিনি নিজের অর্থনৈতিক সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরেন। নিজের মেয়াদের এক উত্তাল সময়ে সাফল্যের ভাবমূর্তি বজায় রাখার চেষ্টায় দাবি করেন, তিনি এক ‘সুবর্ণ যুগের’ সূচনা করেছেন। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা ক্রমশ ঘনীভূত হলেও ট্রাম্প তেহরান নিয়ে তার পরিকল্পনা সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ধারণা দেননি। তিনি শুধু বলেন, আমার পছন্দ হলো কূটনীতির মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা। ট্রাম্প তার ভাষণের শুরুতে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত বন্ধ রাখা, অর্থনীতির এগিয়ে চলা ও অপরাধ কমার বিষয় জোরালোভাবে তুলে ধরেন। ট্রাম্পের দাবি, আজ আমাদের সীমান্ত নিরাপদ। দেশের উদ্যম ফিরেছে, মূল্যস্ফীতি কমছে, আয়ও দ্রুত বাড়ছে। অর্থনীতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে জোরোলোভাবে এগোচ্ছে। তিনি আরও বলেন, শত্রুরা এখন ভয় পাচ্ছে। আমাদের সেনা ও পুলিশ শক্তিশালী হয়েছে। বিশ্বে আবার যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদা বেড়েছে। ট্রাম্প আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য দেশের সীমান্ত বন্ধ করার সিদ্ধান্তের ওপর জোর দেন। তবে অভিবাসীদের ব্যাপক হারে বহিষ্কার করার কর্মসূচির কথা ভাষণে উল্লেখ করেননি। তার এ কর্মসূচি রাজনৈতিকভাবে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
দেশ জুড়ে অপরাধের হার নাটকীয়ভাবে কমার কৃতিত্বও দাবি করেছেন ট্রাম্প। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি জটিল। তাদের মতে, কোভিড মহামারীর সময় অপরাধের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল এবং এর পর থেকেই এর নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মেমফিস, নিউ অরলিন্স ও ওয়াশিংটন ডিসির মতো বড় শহরগুলোয় অপরাধ কমার উদাহরণ টেনে ট্রাম্প বলেন, এটা গত বছর তার ন্যাশনাল গার্ড ও ফেডারেল আইনপ্রয়োগকারী বাহিনী মোতায়েনের ফল। বিভিন্ন দেশের ওপর ট্রাম্পের আরোপ করা পাল্টা বাণিজ্য শুল্ক নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আদেশ প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, এটি ‘দুর্ভাগ্যজনক’। ট্রাম্প বলেন, অন্য আইনি ধারার মাধ্যমে বাণিজ্য শুল্ক বহাল রাখা হবে। এ জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হবে না। ভেনেজুয়েলা থেকে জ্বালানি তেল পাওয়ার বিষয়টিও ট্রাম্পের ভাষণে উঠে এসেছে। তিনি বলেন, আমাদের নতুন বন্ধু ও অংশীদার ভেনেজুয়েলা থেকে ৮ কোটি ব্যারেলের বেশি জ্বালানি তেল পেয়েছি।
স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে যথারীতি ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর বিশ্বে আটটি যুদ্ধ থামানোর দাবি করেছেন ট্রাম্প। এর মধ্যে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যকার যুদ্ধবিরতিকে নিজের সাফল্য হিসেবে আইনপ্রণেতাদের সামনে তুলে ধরেন তিনি। যদিও ভঙ্গুর এ যুদ্ধবিরতির মধ্যে গাজায় প্রায়শ ইসরায়েলের হামলায় ফিলিস্তিনিরা প্রাণ হারাচ্ছেন। গত বছর যখন ইরান ইসরায়েল যুদ্ধ প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করা হয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পের এমন বক্তব্য তারই মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফের পুরোপুরি বিপরীত। ফলে বলাই যায়, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে করা এসব দাবিতে ট্রাম্প সুনিপুণভাবে ‘সত্য-মিথ্যা’কে এক সুতোয় গাঁথতে মুন্সিয়ানা দেখিয়েই যাচ্ছেন।
